কভিড-১৯ আর্থিক পুনর্বাসনে গ্রাহকসেবায় ডিপিএসের সঙ্গে বীমা

Posted on by

নিউজ লাইফ লন্ডন ডেস্ক : ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস) ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য ভবিষ্যতে ছোটোখাটো অঙ্কের এককালীন কিছু টাকা পাওয়ার একটি অনন্য সুযোগ। শহর বা মফস্বলের প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই নিজ নামে বা সন্তান ও অন্য প্রিয়জনদের নামে বিভিন্ন মেয়াদি এরূপ স্কিম খুলে থাকেন। সাধারণত ব্যাংকগুলো এ সেবা অনেককাল ধরে দিয়ে আসছে। ইদানীং কিছু নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানও এরূপ সেবা চালু করেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এসব নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কারও কারও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) কর্তৃক এ ধরনের ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার অনুমোদন নেই। তারপরেও তারা এরূপ সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় নানারকম গ্রাহক হয়রানির কথাও শোনা যায়।

ইদানীংকালে বীমা কোম্পানিগুলোও ডিপিএস সেবাটি চালু করেছে এবং তারা এটির সঙ্গে তাদের প্রচলিত বীমাসেবা যুক্ত করেছে। এদের দেখাদেখি কিছু ব্যাংকও তাদের ডিপিএস সেবার সঙ্গে বীমাসেবা যুক্ত করে গ্রাহকসেবায় এগিয়ে এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বাংলাদেশে বীমাসেবার অনুমোদন দেয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানিগুলো তাদের নিজ নিজ ডিপোজিট পেনশন স্কিম ও বীমাসেবা একত্র করে নতুন একটি সেবা চালু করেছে; নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষও হয়তো এটির অনুমোদন দিয়েছে। তবে ডিপোজিট পেনশন স্কিমের সঙ্গে বীমাসেবা যোগ করতে হলে দুটি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ- বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইডিআরএর কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন অনুমোদন নেওয়ার কথা।

আমরা জানি, বাংলাদেশ ব্যাংক ডিপিএস সেবা উদ্ভাবন ও চালুর ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনতা দিয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যাংকগুলো পাঁচ বা দশ বছর মেয়াদি বিভিন্ন পলিসি উদ্ভাবন করে গ্রাহকদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে। এতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই উপকৃত হয়, ব্যাংকের আমানত বাড়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য গ্রাহকের কিছু টাকা সঞ্চয় হয়। কোনো কোনো ব্যাংক আবার এ সঞ্চয়ের বিপরীতে ঋণও প্রদান করে। এ ছাড়া গ্রাহক করদাতা হলে তিনি ডিপিএসের জন্য কর রেওয়াতও দাবি করতে পারেন। তবে এ সঞ্চয়ী হিসাবের জন্য ব্যাংকগুলো তাদের নিয়মনীতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি বছর সার্ভিস চার্জ, আয়কর, কাস্টমস ও এক্সাইজ শুল্ক্ক, ভ্যাটসহ অন্যান্য চার্জ কেটে নেয়। আবার নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে আর্থিক টানাপোড়েন বা অন্য জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহক হিসাবটি বন্ধ করতে চাইলে কিছু চার্জ কেটে গ্রাহককে সে সুযোগ দেওয়া হয়। সে সময় গ্রাহককে হিসাবটি বন্ধ করার দিন পর্যন্ত ডিপিএস চুক্তি অনুযায়ী সঞ্চিত আসল ও লাভ দুটি টাকাই দেওয়া হয়।

অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোও বীমাসেবা উদ্ভাবন এবং চালুর ক্ষেত্রে আইডিআরএ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বিভিন্ন ধরনের বীমা পলিসি নিয়ে গ্রাহকের সামনে হাজির হয়। বেশিরভাগ বীমা প্রতিনিধি গ্রাহককে বিভিন্ন বীমা পলিসির সুবিধাগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করেন। এরপর গ্রাহক আকৃষ্ট হয়ে কোনো একটি পলিসিতে সাইনআপ করে ফেলেন। গ্রাহক যদি সামর্থ্যবান হন বা তার যদি কোনো আর্থিক টানপোড়েন না থাকে, তিনি নির্দিষ্ট মেয়াদের সব কিস্তির টাকা পরিশোধ করলে মেয়াদ শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পান। তবে বীমাচুক্তি অনুযায়ী দুর্ঘটনা বা মৃতজনিত কারণেও বীমাদাবি করা যায়। এ ছাড়া বীমাগ্রহীতা করদাতা হিসেবে কর রেওয়াতের সুবিধা ভোগ করে থাকেন। ইদানীং বীমা কোম্পানিগুলোও বীমা পলিসির বিপরীতে ঋণসুবিধা প্রদান করছে। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে আর্থিক টানাপোড়েন বা অন্য জরুরি প্রয়োজনে বীমাগ্রাহক বীমা পলিসিটি বন্ধ করতে চাইলে তিনি প্রথম বছরে কিছুই পান না; দ্বিতীয় বছর থেকে অল্প পরিমাণে কিছু টাকা পান। কারণ অনুসন্ধান করলে বীমা কোম্পানিগুলো বা আইডিআরএ জানায় যে গ্রাহককে একটি পলিসি খোলাতে কোম্পানিগুলোকে কমিশন প্রদানসহ অনেক টাকা খরচ করতে হয়; এ কারণে তারা যথাসময়ের আগে পলিসি ভাঙালে বীমাগ্রাহককে প্রথম বছরে আসল টাকা বা বীমা সুবিধার কিছুই দিতে পারেন না এবং দ্বিতীয় বছর থেকে আসল টাকার অল্প পরিমাণে কিছু দিতে পারেন। তবে বীমা চুক্তির এ শর্ত বেশির ভাগ সেবাগ্রহীতা অবগত থাকেন না বা এটি বীমা চুক্তিতে কোনোরকমে বলা থাকলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতার কাছে যথাযথ ও সুস্পষ্ট হয় না।

এমনই একটি অবস্থায় বীমা কোম্পানিগুলোর কেউ কেউ ব্যাংকের বহুল প্রচলিত ডিপিএস সেবাটি নিজেরাই দেওয়া শুরু করেছে; তবে এটির সঙ্গে তারা বীমা সুবিধা যোগ করে সেবার ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি অভিনবত্ব এনেছে। এতে বীমার সব সুবিধাই বিদ্যমান। এ ছাড়া এখানে আরেকটি নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে- যেমন কেউ দুর্ঘটনাজনিত কারণে আয় করতে অসামর্থ্য হয়ে বা মৃতজনিত কারণে কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হলে বীমা কোম্পানি ওই বীমা কিস্তি চালিয়ে যাবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নমিনি বা উত্তরাধিকারীদের কাছে বীমা চুক্তির সমুদয় টাকা পরিশোধ করবে।

ডিপিএস সেবাটির সর্বজনীনতা রক্ষার্থে বীমা কোম্পানিগুলোর ডিপিএস ইস্যুর জন্য পূর্বানুমোদন আবশ্যক করে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করতে পারে এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকের মতো সুবিধা দিতে তাদের বাধ্য করতে পারে। আবার বিকল্প অর্ডারের মাধ্যমে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ডিপিএস প্রদানকারী বীমা প্রতিষ্ঠানকে মেয়াদপূর্বে গ্রাহকের ডিপিএস ভাঙানোর পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং ডিপিএসের জমাকৃত আসল টাকা ফেরতদানের আদেশ দিয়ে আর্থিক টানাপোড়েনের শিকার ডিপিএস গ্রাহকের যথাযথ সেবা নিশ্চিতে এগিয়ে আসতে পারে। এরূপ বিধান ও আদেশের মাধ্যমে বহু ডিপিএস গ্রাহক যথাযথ প্রতিকার পাবেন, বিশেষ করে যারা বর্তমানে কভিড-১৯ চলাকালীন আর্থিক টানাপোড়েনের শিকার এবং নিয়মিত প্রিমিয়াম প্রদান করতে পারছেন না।
ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম,
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x