ভোগান্তির অপরনাম লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে ৫ মাস অপেক্ষা করে এখনো মেলেনি জন্মনিবন্ধন

Posted on by

নিউজ লাইফ লন্ডন ডেস্ক : বিলেতে বসবাসরত অনেক ইইউ নাগরিকদের রঙিন স্বপ্ন অন্ধকারের কালোপাহাড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে । এসব স্বপ্নহারাদের একজন সালমা আক্তার। সাগর পাড়ের লন্ডনে বসবাসরত একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা তিনি ।

ব্রিটিশ এক্সিট’ সংক্ষেপে ব্রেক্সিট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসা বা ব্রেক্সিট সম্পন্ন হয় ৩১ জানুয়ারী ২০২০।এর পর আরো এগারো মাস ছিল ট্রানজিশনাল পিরিয়ড।অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সাথে ইইউ’র সব সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্য চুক্তি ছাড়া অন্য সব চুক্তির অবসান ঘটলেও ব্রিটেনে বসবাসরত ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য ইইউ’র কিছু কিছু আইন বলবৎ আছে এখনো ।কিন্তু কতদিন এ আইন বহাল থাকবে বলা কঠিন। ইইউ’ র ঐসব লোভনীয় আইনের মধ্যে খুব সহজ শর্তে নিজ দেশ থেকে জীবন সঙ্গী ,সন্তান , বাবা মা সহ নিকট আত্মীয়দের ব্রিটেনে আনার সুযোগ অন্যতম।এই সুযোগ খোদ ব্রিটিশ নাগরিক বা ইইউ ভুক্ত দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য কার্যকর নয় ।এ ধরণের লোভনীয় সুযোগের সুবাদে অনেকে তাদের প্রিয়জনকে যুক্তরাজ্যে আনতে সক্ষম হলেও লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সালমারা।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে মা কে ব্রিটেনে আনার সিদ্ধান্ত নেয় সালমা আক্তার। সেভাবেই চলতে থাকে প্রস্তুতি।কাগজ পত্র ও আনুষঙ্গিক সবকিছু যোগাড় শেষে সেগুলো জমা দেবার আগে ক্রস চেক করতে গিয়ে দেখে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ইস্যু করা জন্ম নিবন্ধনে মায়ের নামের বানানে সামান্য ভুল করেছে কতৃপক্ষ।তাৎক্ষণিক ভাবে তিনি ছুটে যান হাইকমিশনে।সেখানে কি হয়েছিল আসুন সেকথা সালমা আক্তারের মুখ থেকে সোনা যাক।

বাবা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে।মা বড় অসহায়।তাকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘ কয়েকমাস বিরামহীন চেষ্টা করে সব কাগজ জোগাড় করেছি। এবার জমা দেবার পালা। শেষ মুহূর্তে চোখে পড়লো লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে ইস্যু করা জন্ম নিবন্ধনে মায়ের নামের বানানে একটা অক্ষর ভুল। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো ।বিশ্বমহামারীর এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে কোনো কাজ যে সহজে করা যাবে না তা ইতিমধ্যে ভুক্তভোগীদের মুখ থেকে জানতে পেরেছি।আমার স্বামী অসুস্থ। ছেলে মেয়েরা ছোট। সব কাজ প্রায় নিজেকেই করতে হয়।

১৫ মার্চ ২০২১ লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনে গিয়ে দেখি মূল ভবনের বাইরে বিশাল লাইন।আমিও লাইনে দাঁড়ালাম।আকাশ ভরা কালো মেঘ। মাঝে মাঝে টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি ।বাতাসে বেশ ঠান্ডা।অফিস থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে কার কি প্রয়োজন জানতে চাইলেন।লাইন উপেক্ষা করে কয়েকজন বয়জোষ্ঠদের সাথে আমাকেও অফিসের ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেন। জানতে চাইলেন সব কাগজের ফটোকপি সাথে করে এনেছি কিনা।

ব্রিটেনে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে স্ক্যানার ও ফটোস্ট্যাট মেশিন থাকে।সুতরাং লন্ডন শহরে রাষ্ট্রীয় কোনো অফিসে ফটোস্ট্যাট মেশিন থাকবে না ভাবতেও পারিনি ।বিনয়ের সাথে ভদ্রলোককে বললাম দুঃখিত ফটোকপি করে আনা হয়নি। বাইরে বৃষ্টির সাথে প্রচন্ড ঠান্ডা।এ এলাকা আমি চিনি না। কোথায় ফটোকপি করা যাবে বললে আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।জবাবে ভদ্রলোক বললেন সমস্যা নেই কর্তব্যরত অফিসার প্রয়োজনমতো ফটোকপি করে নেবেন। আপনি বসুন।

দেড় ঘন্টা পর আমার সিরিয়াল এলো।কিছুই না দেখে আমাকে সব কাগজের ফটোকপি করে আনতে বলা হলো।বললাম ওই ভদ্রলোক যে বললেন এখানে ফটোকপি করার ব্যবস্থা আছে।জবাবে তিনি বললেন যে এ কথা বলেছে তাকে গিয়ে বলেন ফটোকপি করে দিতে। ইট ইজ নট মাই বিজনেস।

অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাইরে থেকে ফটোকপি করে আনলাম। কর্তব্যরত অফিসার কাগজপত্র দেখে বললেন মহামারীর কারণে সব বন্ধ।এখন কিছুই হবে না। এক মাস পরে খোঁজ নেবেন। আমি বললাম সব বন্ধ তাহলে অফিস খোলা কেন ? জবাবে কিছু না বলে শুধু হাতের ইশারায় আমাকে চলে যেতে বললেন।

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের ব্যাবহারে হতাশ সালমা আক্তার এবার দেশে যোগাযোগ করলেন। সেখান থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হল ভুল লন্ডন অফিস করেছে সুতরাং এটা শোধরানোর দায়িত্ব তাদের।এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।
মুঠো ফোন বেজে উঠলো। সালমা আক্তারের ফোন। পুরো ঘটনা আমাকে খুলে বললেন। অনুরোধ করলেন আমি যেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরে তার মায়ের কাজটি দ্রুত করার জন্য উদ্যোগী হই ।

সরকারি অফিসে বৈধ কাজের জন্য কোনো নেতার পায়ে অশ্রুর অঞ্জলি দেবার মানুষ আমি নই। কিন্তু লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে তেমন কারো সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। বরং তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেক। এখন উপায় ? তবে কি সালমা আক্তারের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যাবে ?

দীর্ঘ প্রবাস জীবনে ইউরোপের অনেক দেশে থেকেছি। সব চাইতে বেশি সময় থাকা হয়েছে এ অঞ্চলে মানবতার জন্য বড় একটি দৃষ্টান্ত ইতালিতে।মধ্য ইউরোপের সমৃদ্ধিশালী দেশ ইতালির জীবনে নানা সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম।প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য বাংলা স্কুল ,মিউজিক্যাল স্কুল , বাংলা ও ইংরেজিতে ইতালিয়ান ড্রাইভিং গাইড বই আকারে প্রকাশ ,সহজ শর্তে ইতালিয়ান ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান আন্দোলনের রূপকার, বাংলা পত্রিকা প্রকাশ ,ইতালিয়ান রেডিওতে বাংলা ভাষার অনুষ্ঠান সম্প্রচারের উদ্যোগ ও মাল্টিনেশন সামাজিক সংগঠনের প্রধান হিসাবে দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন ছিল অন্যতম।

রোমস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বর্তমান মান্যবর রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান।অতিশয় ভদ্র লোক , সৎ এবং নিষ্ঠাবান অফিসার হিসাবে সবার প্রিয়।আমার লেখা বই এর প্রকাশনী উৎসবে প্রধান অতিথি হিসাবে রোমে থেকে তিনি উড়ে এসেছিলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বোলছানোতে।সাথে ছিলেন তদানীন্তন বিমান ম্যানেজার। তখন শামীম আহসান ছিলেন কাউন্সিলর।
এছাড়া আমার হৃদয়ের স্পন্দন “নজরুল বাংলা বিদ্যাপীঠ ” এর পক্ষ থেকে প্রতি বছর নতুন প্রজন্ম ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়ে উদযাপন করা হতো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।সেখানেও মিয়া মোহাম্মদ মাইনুল কবীর , হারুন আল রশিদ ,নজরুল ইসলাম সহ ডজন খানের অফিসার প্রতি ফেব্রুয়ারীতে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে আমাকে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ রেখেছেন।

রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান বলেন ” আপনারা প্রত্যেকেই এক একজন রাষ্ট্রদূত। মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন আপনারা।আমরা কাজ করি অফিসে বসে।আপনাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক সহজ হলে প্রবাসে দেশ ও জাতির সুনামের পারদ ঊর্ধ্বমুখী হবে।

রোমস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রত্যেকের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকার সুবাদে প্রচুর কাজ করার সুযোগ হয়েছে।তাতে উপকৃত হয়েছে দেশ কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট সবাই। কিন্তু লন্ডনে তেমনটি হয় নি।অবশ্য সে ব্যর্থতা আমার।অকপটে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই।লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাথে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার ভান্ডার বেশ সমৃদ্ধ।সব বলা সম্ভব নয়।এতে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে। একটা ছোট্ট ঘটনা বলি।

২০১৯ সাল ।আমি তখন ব্রিটেনে অতিপরিচিত সর্বত্র আদৃত ও প্রভাবশালী সামাজিক সংগঠন সুন্দরবন ফাউন্ডেশন ইউকের সাধারণ সম্পাদক। দায়িত্ব নিয়েই নানান সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য পরিকল্পনা হাতে নেই।এর মধ্যে দিনব্যাপী নতুন প্রজন্ম ও বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের উদ্যোগ ছিল অন্যতম।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে পালনের ব্যাপারে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিক।তাছাড়া এমন একটি অনুষ্ঠানে লন্ডনস্থ হাইকমিশনের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কারণ প্রবাসে তারা আমাদের অবিভাবক।
অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু ঠিক হতেই মান্যবর হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিমকে লিখিত আমন্ত্রণ পাঠাই।যথা সময়ে কোনো উত্তর না পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে বলা হয় ওই দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারী হাই কমিশনে একই ধরনের অনুষ্ঠান হবে।কাজেই হাইকমিশনার আপনাদের অনুষ্ঠানে যেতে পারবেন না।

আমি লিখিত আমন্ত্রণ জানিয়েছি সুতরাং জবাব লিখিত কেন পেলাম না,কেন টেলিফোনে করে জানতে হলো সে প্রশ্ন থেকেই গেলো। যদিও হাইকমিশনের কথাটা আমার কাছে খুবই যুক্তিসঙ্গত মনে হলো। আমি অনুরোধ করলাম হাইকমিশনের যে কোনো অফিসার সারা দিনের মধ্যে ১৫/২০ মিনিটের জন্য আসা সম্ভব কি না। উত্তর পেলাম না সেটাও সম্ভব হবে না।

এদিকে এই না শব্দটা শুনতে পার হলো ৮ দিন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অনুষ্ঠানে আমার সম্পাদনায় একটা ম্যাগাজিন প্রকাশের জন্য সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে।ইতিমধ্যে সেখানে বাণী দেবার জন্য অনুরোধ করে লন্ডনস্থ হাই কমিশন, মেয়র, এমপি ও প্রশাসনের অনেককে ইমেইল করেছি।ইতিমধ্যে সবার কাছ থেকে লিখিত পেয়েছি। পাইনি বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে কোনো ইমেইল । টেলিফোনে করে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে হাই কমিশন থেকে বলা হলো আপনাদের জন্য বাণী লেখার কাজ চলছে । অপেক্ষা করুন।

একটা বাণী লিখতে এতদিন লাগার কথা না।এদিকে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।২/৩ দিন আগে পাণ্ডুলিপি প্রেসে পাঠাতে হবে।আবার হাইকমিশনে টেলিফোন করলে বাণীতে কি লিখতে হবে তার ড্রাফট করে দিতে বলা হলো।১/২ ঘন্টার মধ্যে বাণীর ড্রাফট লিখে পাঠালাম । দেখতে দেখতে আরো পার হলো ২ দিন। টেলিফোন করলে এবার বলা হলো বাণী এমন না একটু পরিবর্তন করে এ ভাবে লিখে দিন।কি আর করার।মনে হলো আমার মেয়ের বিয়ে ।সব দায় আমার। তাদের কথা মতো নতুন আঙ্গিকে বাণী লিখে পাঠালাম।

অনুষ্ঠানের দুইদিন আগে পাণ্ডুলিপি প্রেসে পাঠাতে হবে। সব কাজ শেষ শুধু হাইকমিশনারের বাণীর জন্য অপেক্ষা। ফোন করলে এবার বলা হলো। সরি এতো অল্প সময়ের মধ্যে ম্যানেজ করা গেলো না। নেক্সট টাইমে আরো আগে থেকে বলবেন।প্রশ্ন করলাম আগে মানে কত আগে ? এবার তো ১৫/২০ দিন আগে বলেছি।নেক্সট টাইমের জন্য ছ মাস আগে বললে চলবে ? নাকি এক্ষুনি আগামী বছরের জন্য একটা ইমেইল ঠুকে দেব?

প্রবাসে সরকারি অফিসের ভিতরে এমন নীরব রসিকতার কথা হাইকমিশনার বা সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানেন কিনা জানিনা। তবে এ ঘটনা শুনে অনেকে বলেছেন।রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বাংলাদেশ মিশন গুলো এখন আর কাজ করতে চায় না।তার প্রমাণ,এদেশের আইন অনুসারে রেজিস্ট্রেশন নেই , নেই সংগঠন প্রধানের কোনো বৈধতা।এমন সংগঠনের অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার স্বয়ং প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার নজির সাগর পাড়ের লন্ডনে একেবারে কম নয়।তার মানে শুধু কি রাজনৈতিক প্রটোকল দিতেই ব্যস্ত সময় পার করে বাংলাদেশ মিশন?

আগেই বলেছি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে তেমন কারো সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই।আমার লেখার মধ্যে তেমন শব্দটি ব্যবহার করেছি।তার মানে একেবারে কারো সাথে আমার পরিচয় নেই এটা বলা যাবে না।

খুব চৌকস একজন কূটনীতিক ।যার খ্যাতির কথা বলে শেষ করা যাবে না ।তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর এস এম জাকারিয়া হক। এনটিভির টকশোতে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমরা দুজনেই ছিলাম প্যানেল মেম্বার।তার সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয় বেশ নাটকীয় ভাবে। সেই গল্প একটু পরে বলি।

২০১৫ সালে দেশে গিয়ে দেখি ব্যাঙ্কিং সহ কোন কিছু করা যাচ্ছে না জাতীয় পরিচয় পত্র ছাড়া।আমি লাল পাসপোর্ট হোল্ডার হলের বাংলাদেশী পাসপোর্ট আছে আমার। যতদূর জানি পাসপোর্ট হচ্ছে একটা মানুষের পরিচয়ের সবচাইতে শক্তিশালী মাধ্যম।কিন্তু সেটার কোনো গুরুত্ব নেই দেশে।

সে যাই হোক জাতীয় পরিচয় পত্রের জন্য চেষ্টা তদবির করে সেবার কোনো কুল কিনারা হলো না।নির্ধারিত সময়ে ফিরে এলাম লন্ডনে। ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার দেশে যাবার আগেই ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকি। কিন্তু আবার নিরাশ হয়ে ফিরে আসার পালা।নির্ধারিত অফিসে গেলে অপ্রজনীও প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয় । কাজের কাজ কিছুই হয় না।প্রতিদিন নতুন নতুন কাগজ পত্র আনতে বলেন । মাগার ফর্ম দেয় না।

দেশের বন্ধু বান্ধব কাউন্টারে কিছু টাকা পয়সা দিতে বলে। আমি সে পথে না হেটে শেষ মুহূর্তে খুলনা থানা সদর নির্বাহী অফিসার এ টি এম শামীম মাহমুদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তার অফিসে যাই। পিয়নকে দিয়ে আমার সাংবাদিকতার কার্ড ভিতরে পৌঁছে দিতেই তিনি ডেকে পাঠালেন।

বললেন আপনারা কাউন্টারে কেন যান?

কোথায় যাবো ? আমার কাছে আসবেন।

উত্তরে বলি ইট ইজ নট ইওর জব ম্যান।

নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন ভীষণ বিনয় ও পরিমিতিবোধের অধিকারী এই অফিসার।

পর পর দুইবার দেশে গিয়ে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে যা সম্ভব হয়নি ম্যাজিকের মতো এবার তাই হলো।ধীর স্থির নম্র ও বিনয়ী এ টি এম শামীম মাহমুদ তার রুমে বসিয়ে রেখে পিয়নের মাধ্যমে আমার সব কাজ করে দিলেন।

আমার কাজ শেষ। বাকি কাজ ঢাকা হেড অফিসের । আপনার কার্ড কবে পাবেন এই মুহূর্তে বলা ঠিক হবে না।জমা রশিদ দিয়ে প্রায় সব কাজ করা যাবে। তার পরেও কোথাও ঝামেলা হলে মুঠো ফোনে কল করবেন।আমি কথা বলবো। বললেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এই মানুষটি ।কর্মের দ্যুতি ছড়ানো শামীম মাহমুদ তার কথা রেখেছিলেন।

এনটিভির টকশোতে প্রসঙ্গক্রমে আমার জাতীয় পরিচয় পত্র নিয়ে বিড়ম্বনার গল্পের অংশ বিশেষ বলেছিলাম। কারণ তখনও সেটা হাতে পাইনি। অনুষ্ঠান শেষে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর এস এম জাকারিয়া হক আমাকে কাছে ডাকলেন।নিজ থেকে আগ্রহী হয়ে সব ঘটনা শুনে জাতীয় পরিচয় পত্র সংক্রান্ত যা আছে সব তাকে ইমেইল করতে বলেন।আমাকে আরো বললেন একটু সময় দিন দেখি কি করতে পারি।

এর কিছু দিন পর একে একে ঢাকায় দুজন সচিবের সাথে আমার কোন পরিচিতকে তার রেফারেন্স দেখা করতে বলেন তিনি ।কিন্তু কোনো কাজ হলো না। একজন সচিব তো জাতীয় পরিচয় পত্র অধিদপ্তরের সামনে থাকা দালালদের সাথে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন । পরোপকারী মিস্টার জাকারিয়া এসব শুনে নিরাশ হলেন না।বললেন আই ওয়ান্ট টু সি এন্ড অফ দি জার্নি। এলাও মি মোর টাইম প্লিজ।অবশেষে কয়েক মাস পর খুলনার ডিসি সাহেবের সক্রিয় সহযোগিতায় আমার জাতীয় পরিচয় পত্র গল্পের ইতি টানা সম্ভব হয়েছিল।

সালমা আক্তারের জন্ম নিবন্ধন জটিলতা নিরসনে আমার মাথায় দায়িত্বের প্রতীক মিস্টার হকের নামটি ক্লিক করলো। মুঠো ফোনে কল করে বিস্তারিত জানালাম। তিনি কাগজ পত্র ইমেইল করতে বললেন। কয়েকদিন পর লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের অফিস সহযোগী মোঃ ফয়সাল আমাকে ফোন করে বললেন মিস্টার হক তাকে সালমা আক্তারের ফাইলটি তদারকির দায়িত্ব দিয়েছেন।এ ধরণের সমস্যা নিয়ে ১/২ জন নয় অনেকেই অপেক্ষায় আছেন বলেও জানান মিস্টার ফয়সাল । তিনি আরো বললেন জন্ম নিবন্ধনের জন্য অফিসে নতুন সফটওয়্যার আসতে যাচ্ছে। ব্যাবহারকারীরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।প্যানডেমিক সিচুয়েশনের জন্য সবকিছু ধীর গতিতে চলছে। সুতরাং ৮/১০ দিন সময় লাগতে পারে।নতুন সফটওয়্যার সেটআপ হলেই জানানো হবে। তারপর সালমা আক্তার পেয়ে যাবেন তার কাঙ্খিত নির্ভুল জন্ম নিবন্ধন সনদ ।

দেখতে দেখতে প্রায় তিন সপ্তাহ পার হলো।কোনো ফোন এলো না।মোঃ ফয়সালের মুঠোফোন নাম্বার আমার কাছে নেই। তাই যোগাযোগ করে শেষ খবর সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এদিকে দিন দিন উতালা হচ্ছেন সালমা আক্তার। সামান্য কাজের জন্য মিস্টার হককে বার বার নক করাও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে না। এখন কি করি ?

মিস্টার হককে মুঠোফোনে বার্তা পাঠালাম।Any update regarding Salma Akter ? সাধারণত মিস কল বা বার্তা পাঠালে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে উত্তর দেন। আমার বার্তা তিনি পড়েছেন দুই দিন আগে ।কোনো উত্তর নেই । তার নীরবতা আমাকে ভাবিয়ে তুললো।আবার বার্তা পাঠালাম। এবার আর কাজের কথা নয়। কুশলাদি জানতে চাইলাম।লিখলাম কেমন আছেন আপনি ? কাজের চাপ কি খুব ?

এর একদিন পর কল ব্যাক করলেন তিনি। বললেন হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ফজলে রাব্বির সাথে কথা হয়েছে । সময় পেলেই সালমা আক্তার যেন তার সাথে দেখা করেন।

মোঃ ফয়সাল ও মিস্টার হকের নীরবতার পেছনের গল্প সুখকর নয় বুঝতে বাকি রইলো না।বললাম প্যানডেমিক সিচুয়েশনের জন্য গোটা দুনিয়া থমকে গেছে। আমরাও সেই নির্মম বাস্তবতার স্বীকার। সুতরাং জন্ম নিবন্ধন সনদ এই মুহূর্তে দিতে সমস্যা হলে মিস্টার রাব্বি একটা কভার লেটার দিতে পারেন। তাতেই কাজ হবে।আমি আইনজীবীর সাথে কথা বলেছি।প্রয়জনে আইনজীবীর কাছ থেকে ড্রাফট করে নেয়া যাবে। আইনজীবীদের মতে লেটারে লিখতে হবে জন্ম নিবন্ধন সনদ পত্রে সালমা আক্তারের মায়ের নামের বানানে একটা অক্ষর ভুল হয়েছে ।এটা ক্লারিক্যাল মিস্টেক। প্রকৃত নাম এটা হবে।এ ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করা যাবে ইত্যাদি ।

আমার কথা শুনে বেশ পুলকিত মনে হলো মিস্টার হককে। বললেন সালমা ম্যাডাম মিস্টার রাব্বিকে সব খুলে বললে নিশ্চই তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন।

চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল হাই কমিশনে যান সালমা আক্তার। এবার জন্ম নিবন্ধনের সব কাগজ পত্র জমা নেন মিস্টার রাব্বি ।বলেন সার্ভার নষ্ট। দেশ থেকে এটা করে আনতে হবে। ২/৩ মাস সময় লাগতে পারে।ইমেইল এর মাধ্যমে সব কিছু জানতে পারবেন।হতাশ সালমা কভার লেটারের কথা বললে তা একেবারে আমলে নেননি মিস্টার ফজলে রাব্বি।

এ লেখা যখন লিখছি ততদিনে পার হয়েছে পাঁচ মাসের অধিক সময়।এ দীঘ সময় ধরে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভুলের খেসারত দিচ্ছেন সালমা আক্তার। বিগত ৫ মাস অবিরাম চেষ্টা করেও জন্ম নিবন্ধনের সামান্য একটি নামের বানানের সংশোধন করতে বার্থ হয়েছেন তিনি । প্রশ্ন উঠেছে এ ব্যার্থতা আসলে কার ? এ ধরণের কাজের জন্য সময় ক্ষেপন শাররীক মানুসিক ও অর্থনতিক যে ক্ষতি হচ্ছে তার দায়ভার কে নেবে ?

নিজ দেশের কূটনীতি সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরা এবং দ্বি-পক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত সকল রেমিটেন্স যোদ্ধাদের দায়ভার বাংলাদেশ মিশনের ।কিন্তু পাসপোর্ট ইস্যু ছাড়া অন্য কোন দায়ভার তাদের আছে বলে মনেই হয় না। নতুন পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রেও লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে রয়েছে দৃশ্যমান আকাশ চুম্বি অভিযোগ।এ বিষয়ে প্রচুর তথ্য হাতে এসেছে। আগামীতে লেখায় সেই সব ভয়ঙ্কর কাহিনী তুলে ধরবো।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশন গুলোতে পাহাড় সমান অব্যবস্থাপনা,অসৌজন্যমূলক আচরণ,নিয়ম বহির্ভুত কর্মকান্ড ও দুর্নীতির খবর প্রায়ই গণমাধ্যমের সুবাদে জানতে পারি।কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারা দেদারসে চালিয়ে যাচ্ছেন এসব। এতে প্রবাসে বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ।পদে পদে চরমভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। কিন্তু ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগিরা দূতাবাসের ভয়ে কিছুই বলতে সাহস পায় না।

মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশে বাংলাদেশীরা কাজ করতে যান তাদের বেশিরভাগেরই অভিযোগ , তারা দূতাবাস থেকে ন্যূনতম সহায়তা টুকু পান না ।সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের আচরণ প্রবাসীদের ক্ষেত্রে খুবই মর্মান্তিক। মধ্যপ্রাচ্যের যাত্রীরা ঢাকা পৌঁছালে বিমানবন্দরে তাদের সাথে করা অমানবিক ব্যবহারের কথা সবাই জানে। অথচ বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রবাহের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

গত বছর ইতালিতে রোমস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বিরুদ্ধে দালালি সিন্ডিকেট কে সহায়তা করার অভিযোগ দেশের বিভিন্ন মূলধারার গণমাধমে উঠে এসেছিলো।দূতাবাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ইতালি আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী হাইব্রিড নেতা দীর্ঘদিন ধরে দূতাবাসে দালালি করে আসছেন বলে কমিউনিটি নেতারা অভিযোগ করেন।দুর্নীতিমুক্ত দূতাবাসের দাবিতে স্থানীও কমিউনিটি নেতারা ২০২০ সালের ২৭ জুলাই দূতাবাসের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছিলেন। তাদের মূল অভিযোগের লক্ষ বস্তু ছিল আওয়ামী লীগের নেতা ও রোমে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান সিকদারের বিরুদ্ধে। ইতালির মিলান শহরে বাংলাদেশ মিশনের কনসাল জেনারেল ইকবাল আহমেদের বিরুদ্ধেও ভয়ঙ্কর অভিযোগ গণমাধমে ভেসে বেড়াচ্ছে। বর্তমান রাষ্ট্রদূত শামীম আহসান দায়িত্ব নেবার পর রোমস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অবসান হলেও মিলানে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল ইকবাল আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সুরাহা এখনো হয়নি।

দেশের বাইরে বাংলাদেশ মিশনে কর্মরতরা ব্যাপক সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন ।প্রবাসীরাও তাদের প্রয়োজনীয় সেবা নেন চড়া দামে।দেশের তুলনায় অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে।কিন্তু দেশের বাইরে বাংলাদেশ মিশনে কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এবং আচার আচরনে জবাবদিহিতার বালাই নেই ।এর প্রধান কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা । প্রবাসীদের মতে প্রতিটি মিশনে ব্যাপক পরিবর্তন ও সেবা প্রদানের বিষয়টি আরও জোরদার করা সময়ের দাবি ।তা না হলে সামনে ব্রিটেন সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি সালমা আক্তারদের স্বপ্ন পূরণের অনুকূলে থাকবে কিনা তা বলা সত্যি কঠিন। (চলবে … )

লন্ডন : 20.08.2021
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ,লেখক ও কলামিস্ট

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x