আইনের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগের বেড়াজালে আটককৃত সাংবাদিকরা

Posted on by

মোঃ অহিদুজ্জামান : আইনের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা পুরনো। উপমহাদেশে বৃটিশ আমলের বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইন বিতর্কের কেন্দ্রে আসতে দেখা গেছে সময়ে সময়ে। এর মধ্যে সম্ভবত রাষ্ট্রদ্রোহের আইনটি সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ আইনটি নিয়ে ভারতজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে। মাস খানেক ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঔপনিবেশিক শাসনামলের রাষ্ট্রদ্রোহ আইন বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর চলছে তুমুল আলোচনা ও লেখালেখি। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, বৃটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও কেন কার্যকর রয়েছে? আইনটি বাতিলের দাবি করে দায়েকৃত এক মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি এন ভি রমানার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মৌখিকভাবে আরও বলেছে, বিজেপি শাসিত কেন্দ্রসরকার এবং বিভিন্ন রাজ্যসরকার এ আইনটিকে ভিন্নমত দমনের কাজে অপব্যবহার করছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন যে আইন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধ প্রয়োগ করতো, সেটার এখনও প্রয়োজন কেন, সে প্রশ্নও তুলেছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।

ভারতের মতো বাংলাদেশেও দন্ডবিধির ‘১২৪-ক’ তে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের বিধান রয়েছে। আইনটি প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ যে বেশি হচ্ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশেও সময়ে সময়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক থেকে শুরু করে লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক কেউ এই আইনের খড়গ থেকে রেহাই পাননি। দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও সাংবাদিকদের এ আইনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

এর সর্বশেষ শিকার হয়ে প্রায় দশমাস কারাগারে বন্দি আছেন সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী। সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)’র সাবেক সভাপতি তিনি। তিন যুগেরও বেশি সময় সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বিএফইউজে’র বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগ্রাম করেছেন সাংবাদিকদের ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য নিশ্চিত করতে। সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের জন্য সরকার সময়ে সময়ে গঠন করে ওয়েজবোর্ড। এ পর্যন্ত গঠিত বেশিরভাগ ওয়েজবোর্ডে তিনি সদস্য হিসেবে সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৯০ সালে দেশে স্বৈরাচারবিরোধী যে চূড়ান্ত আন্দোলন হয়েছে তখন ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সম্মুখভাগে থেকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তখন দেশের সকল সংবাদপত্র একযোগে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসকের পতন ত্বরান্বিত হয়।

সাংবাদিক সমাজের এ শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর। কর্মস্থল দৈনিক সংগ্রামের মগবাজারস্থ কার্যালয় থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তাঁকে। এ সময় হাতিরঝিল থানার কর্মকর্তা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে। পরদিন আদালতে হাজির করে পাঠানো হয় জেলে। বাস্, গত দশ মাসেও তাঁর জামিন হয়নি, মুক্তি মিলেনি। হাইকোর্টে এক দফা জামিন মঞ্জুর হলেও আটকে যায় চেম্বার আদালতে। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ফুলবেঞ্চে শুনানি শেষে চেম্বার বিচারপতির স্থগিতাদেশ বহাল রাখা হয়। ফেরৎ পাঠানো হয় হাইকোর্টে। হাইকোর্ট দ্বিতীয় দফা শুনানি শেষে নিম্ন আদালতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে জামিনের শুনানি আবারও নাকচ হয়। এখন হাইকোর্টে আরেক দফা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁকে গাজীপুরের কশিমপুর কারাগারে (চিত্রা-১) রাখা হয়েছে। একই মামলায় সংগ্রামের বার্তা সম্পাদক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সা’দত হোসাইন আত্মসমর্পণ করে জেলে আছেন নয় মাস ধরে।

রুহুল আমিন গাজীকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তিনি বিএফইউজে’র সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের চিফ রিপোর্টার ছিলেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন এখন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভাজিত হলেও তিনি অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নে সব মত-পথের সাংবাদিকের ভোটে নির্বাচিত নেতা ছিলেন। সাংবদিকতা পেশায় আছেন চার দশকের বেশি। মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আমাদের বিচারাঙ্গনে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অনেক রায়কে উদাহরণ হিসেবে টানা হয় হরহমেশা। ভারতে State of Rajasthan, Jaipur vs Balchand 1977 AIR 2447 মামলার রায়ে বিচারপতি কৃষ্ণা আইয়ার উল্লেখ করেন ‘প্রাথমিক নিয়ম হলো জামিন, কারাদন্ড নয়। কিন্তু যেখানে পরিস্থিতি ন্যায়বিচার থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, সেখানে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে।’ এ রায় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় জামিনের ক্ষেত্রে নজির হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৭৩-এর সঙ্গে আমাদের কার্যবিধির জামিনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিধান একই রকম রয়েছে। তাই আমাদের দেশে জামিনের ক্ষেত্রেও এ নীতি অনুসরণ করা সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রে হয়ও।

জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন নাকচের সুযোগ তেমন নেই। শুধু তাই নয়, জামিনঅযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে আইনে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৭(১) অনুযায়ী কোনো অজামিনযোগ্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করা হলে বা নিজে হাজির হলে বা তাকে আদালতে হাজির করা হলে, তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মতো অপরাধে দোষী হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ উপস্থিত থাকলেও আদালত ১৬ বছরের কম বয়সী যেকোনো ব্যক্তি বা এই জাতীয় অপরাধে অভিযুক্ত যে কোনো মহিলা বা অসুস্থ ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।

উল্লেখিত আইনি বিধান অনুসারে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী যে কোন বিবেচনায় জামিন পাওয়ার যোগ্য। তিনি গুরুতর অসুস্থ। তাঁর একটি কিডনি অপারেশনের মাধ্যমে ফেলে দেওয়া হয়েছে। উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসের রোগী তিনি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করতে পারায় তাঁর জীবন হুমকির মুখে। মুক্তিযুদ্ধে অবদান, সামাজিক অবস্থান, সাংবাদিক সমাজের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী ভূমিকা ইত্যাদি বিবেচনায় তাঁর জামিনের জন্য দশ মাস অপেক্ষার করার কোনো কারণ দেখছেন না আইনজ্ঞরা।

দেশে প্রতিদিনই জামিন হচ্ছে শত শত অভিযুক্তের। করোনাকালে ভার্চুয়াল কোর্টে বহু দাগী আসামি এমনকি খুন, রাহাজানির মামলায় অভিযুক্তদেরও জামিন হতে দেখা যাচ্ছে। আলোচিত রন হক শিকদার বা হাজি সেলিমপুত্রের জামিন হয়েছে, চাঞ্চল্যকর ফৌজদারি অপরাধের মামলায় অনেকেরই জামিন হচ্ছে। এমতাবস্থায় সাংবাদিকদের জামিনের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব বা সময়ক্ষেপণ কেন হচ্ছে সেটাই সমাজের বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন।

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x