ভারতের সীমান্তগুলো একেবারেই বন্ধ করা দরকার

Posted on by

মোঃ অহিদুজ্জামান : বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস ভারতকে বিপর্যয়কর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। করোনার প্রথম ঢেউ পাশ্চিমা দেশগুলোতে আছড়ে পড়লেও দ্বিতীয় ঢেউ (ডবল মিউট্যান্ট) আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতে। এর মধ্যে ভারতের ১০টি রাজ্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। করোনা মৃত্যু আর লাশ দাহ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে মানুষ। এরই মধ্যেই দেশটি বিশ্বের করোনাভাইরাস আক্রান্তে দ্বিতীয় এবং মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে দেশটির অনেক রাজ্যের বড় বড় শহরে রাতে কার্ফু জারি করা হয়েছে। দেশটিতে এর মধ্যেই ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৮ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৯৯ জন।

ভারতের মিডিয়াগুলোতে খবর বের হয়েছে, রাজধানী দিল্লিতে করোনায় মৃতদের দাহ করতে লাশ নিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে স্বজনরা। প্রতিদিন দেশটিকে করোনা আক্রান্ত ও মৃতের পারদ ওপরে উঠছে। এ অবস্থায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা জরুরী। ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পারদ ঊর্ধ্বমুখি। অথচ দুই দেশের মানুষ সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত করছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশে ভাইরাসটির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অসম্ভব নয়। কারণ সীমান্ত খোলা রাখায় প্রতিদিন ভারত থেকে মানুষ সীমান্ত পাড় হয়ে বাংলাদেশে আসবেই। আবার বাংলাদেশ থেকেও মানুষ ভারতে যাবেন। ফলে পশ্চিমা দেশগুলো যেমন করোনার কারণে একে অন্য দেশের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল; বাংলাদেশের উচিত তেমনিভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সূত্র জানায়, গত শুক্রবারও বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ৬১০ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় করণীয় কি জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, করোনাভাইরাসের আর কোনো বিপর্যয় এড়াতে এখন ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখার উচিত। এ বিষয়ে আমাদের মতামত আমরা যথাযথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। যদিও সরকারের উপরের মহল থেকেই এই সিদ্ধান্ত আসবে।

ভারতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় এবং সেখানে শনাক্ত করোনার নতুন ধরনটি ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে প্রতিবেশী এই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মঙ্গলবার করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির এক সভাতেও ভারতে সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত বন্ধ রাখার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অতঃপর সে পরামর্শ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়।

ভারতের ডবল মিউট্যান্ট ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় সরকারের করণীয় কি জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতে সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক হওয়ায় আমরা অবিলম্বে সরকারকে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। সীমান্ত যদি পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে অবশ্যই ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে।

জানা যায়, ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের আগেই। নতুন এই করোনাভাইরাসের পেছনে করোনার নতুন ধরন ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। যে কারণে ভারত এরই মধ্যে ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করোনা সংক্রমণের দেশে পরিণত হয়েছে। এখন ভারতের আগে রয়েছে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শনিবারও ভারতে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৬ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২ হাজার ৬২৪ জন। এ অবস্থায় দিল্লি, মুম্বাইসহ কয়েকটি শহরে কার্ফু জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশের পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও করোনাভাইরাস ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী জনসভা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এর নতুন ধরনটির নাম বি.১.৬১৭। যা শুরুতে দুটি মিউটেশনসহ শনাক্ত হয়। সেগুলো হচ্ছে- ই৪৮৪কিউ ও এল৪৫২আর। ২০২১ সালের শেষের দিকে ভারতের একজন বিজ্ঞানী নতুন এই ধরনটি শণাক্ত করেন। যা সম্প্রতি বিস্তারিত আকারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) কাছে উপস্থাপন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য নতুন হুমকি করোনার ভারতীয় এ নতুন ভ্যারিয়েন্ট। তিনবার রূপ পাল্টাতে সক্ষম করোনাভাইরাসের এ নতুন ধরন বাতাসের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ছড়াচ্ছে অতিদ্রুত। সেই সঙ্গে প্রথম করোনাভাইরাসের চেয়ে এটি তিন গুণ বেশি শক্তিশালীও। এ অবস্থায় নতুন এই করোনাকে রুখতে বাংলাদেশে এর সংক্রমণ রোধে আপাতত ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করতে হবে। কারণ বাংলাদেশে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যু রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। সর্বাত্মক লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধে চলছে সংক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। কিন্তু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি ও লকডাউন কিছুই মানছেন না। এরই মধ্যে মার্কেট-শপিংমলসহ অনেক কিছু খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এমনকি ২৮ এপ্রিল গণপরিবহন খুলে দেয়ার ইংগিত দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিদিন ভারতে যাচ্ছেন মানুষ বাংলাদেশ থেকে। আবার ভারত থেকেও মানুষ সীমান্তপাড় হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অথচ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে করোনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে করোনা মহামারিতে লাগাম ছাড়িয়ে গেছে। করোনার নতুন রূপ ট্রিপল মিউট্যান্ট বা তিনবার রূপ পরিবর্তনকারী ভাইরাসটি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, যা অতিদ্রুত ছড়াচ্ছে এবং তিনগুণ বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। এতে রোগীর মৃত্যু দ্রুত হচ্ছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ভারতের করোনার নতুন রূপ বাংলাদেশের জন্যও চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

করোনাভাইরাস বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানের অংশ হিসেবে সবসময় পরিবর্তিত হতে থাকে। কিছু মিউটেশন ভাইরাসকে দুর্বল করে দেয়। আবার কিছু মিউটেশন এটাকে শক্তিশালী করে তোলে। যা অপেক্ষাকৃত দ্রুত ছড়ায় ও সংক্রমণ বাড়ায়। ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত মার্চের শেষের দিকে এই ‘ডাবল মিউট্যান্ট’র অস্তিত্বের বিষয়টি স্বীকার করে।

ভারতে করোনাভাইরাসের ডবল মিউন্ট্যান্ট শুরু হওয়ার পর গত ১৬ এপ্রিল ভারত সরকার তা স্বীকার করে। অতঃপর সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ডাবল মিউটেশনের এই ধরনটি বেলজিয়াম, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নামিবিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ আরো কয়েকটি দেশে পাওয়া গেছে। কিন্তু, এই ধরনটি দ্রুত হারে ছড়ানোর বিষয়টি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ভারতের নতুন করোনার ডবল মিউট্যান্ট যদি বাংলাদেশে পাওয়া যায়, তাহলে উপায় কি জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভারতে যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে এটা অসম্ভব নয়। কারণ প্রতিদিন প্রচুর মানুষ ভারত থেকে স্বাভাবিকভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসছে। স¤প্রতি সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পেছনে করোনাভাইরাসের কোন ধরনটি আছে, তা দেখার জন্য বাংলাদেশের এখন জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ওপর জোর দেওয়া উচিত। করোনা সংক্রান্ত পরামর্শক কমিটির সদস্য স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের প্রবেশ ঠেকাতে সরকারের কঠোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার পরামর্শক কমিটির সভায় আর কোন কোন জায়গা থেকে টিকা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ভারতের এই নতুন করোনা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হতে যাচ্ছে দুইভাবে। একটা হলো ভারতে যে অসংখ্য সংক্রমণ হচ্ছে- সেখান থেকে এ সংক্রমণ আমাদের দেশে আসতে পারে। যেহেতু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ অনেক বেশি। লাখ লাখ মানুষ যায় ভারতে। এটা হচ্ছে বড় ঝুঁকি। এটা ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত আপাতত বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ বাংলাদেশে যে নিজেদের সমস্যা আছে করোনার, তার ওপর ভারত থেকে এসে সমস্যাটা যেন বেশি গভীর না করে। সে ব্যাপারে আমাদের খুব মনযোগ দেয়া উচিত। ভারত থেকে আসলে তাকে দুই ডোজ টিকার সার্টিফিকেট দেখানো উচিত। বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি ভারতে যায় জরুরি প্রয়োজনে, সে ক্ষেত্রে তাকেও ডাবল ডোজ টিকার সার্টিফিকেট নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ তার।

সুতরাং ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের স্থল সীমান্ত বন্দরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হোক। ভারতের পশ্চিম বাংলায় করোনা সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সে জন্য আমরা মনে করি যে, ভারতের সঙ্গে স্থলপথের যে সীমান্ত আছে, এই সীমান্তগুলো একেবারেই বন্ধ করা দরকার।

More News from এক্সক্লুসিভ

Developed by: TechLoge

x