বাঁশখালীর শ্রমিক হত্যার দায় কার

Posted on by

মোঃ অহিদুজ্জামান : দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভের ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ৫ জন শ্রমিক নিহত ও ৬ পুলিশসহ ৫০ জনের অধিক শ্রমিক আহত হয়েছে। হতাহতের এই ঘটনা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত, অনভিপ্রেত, দু:খজনক ও মর্মান্তিক। পবিত্র রমজানে কর্মঘণ্টা ৯ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৬ ঘণ্টা, শুক্রবার ৪ ঘণ্টা, প্রতি মাসের বেতন ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ, ইফতার ও সাহারীর সময় বিরতির দাবি জানিয়ে আসছিল কর্মরত প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক। শনিবার কাজে যোগ না দিয়ে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল। এক পর্যায়ে পুলিশ এলে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশের গুলীতে হতাহতের ওই ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের দাবী-দাওয়া খুব একটা অযৌক্তিক ও উপেক্ষাযোগ্য বলে মনে করা যায় না। অনেক দেশে, এমন কি আমাদের দেশেও পবিত্র রমজান উপলক্ষে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক-কর্মচারীদের এধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। এস আলম গ্রুপ অর্থনৈতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। তার পক্ষে বর্ণিত দাবি-দাওয়া পূরণ করা মোটেই অসম্ভব নয়। তারপরও শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ডাকার প্রয়োজন কেন হলো এবং পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হলো কেন, তা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী রাখে। এই প্রথম যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে কেন্দ্র করে হতাহতের ঘটনা ঘটলো, এমন নয়। এর আগেও অনুরূপ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। শুরু থেকেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের আপত্তি ছিল। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ ইত্যাদি নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সংঘটিত সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন গ্রামবাসী নিহত হয়। সর্বশেষ নিহত ৫ জনকে যোগ করলে মোট নিহতের দাঁড়ায় ১২ জনে। এতগুলো মানুষের এভাবে প্রাণ দেয়ার ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক বললেও কম বলা হয়।

এলাকাবাসী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধী ছিল। কারণ, তাতে তাদের জমি হারানোর শংকা ছিল। পরে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে অসন্তুষ্টচিত্তেই এলাকাবাসী তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। নতুন করে তাদের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দেয় তখন যখন তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে টালবাহানা করা হয় এবং অর্থের পরিমাণ কম দেয়া হয়। তাদের প্রতি ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও অত্যাচার-জুলুমও করা হয়। ফসলি জমি, বাসগৃহ ইত্যাদি হারানোসহ ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়া বা কম পাওয়ার ক্ষোভ এখনো এলাকাবাসীর মধ্যে রয়েছে। সচেতন মহলের আপত্তিটা ছিল অন্য জায়গায়। তার মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময় শেষ হয়ে গেছে। পরিবেশদূষণে এর বিপুল ভূমিকার প্রেক্ষাপটে অনেক দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নতুন করে স্থাপনের তো প্রশ্নই ওঠে না। এ বিরোধিতা বা আপত্তি মূলত নীতিগত, যা আদৌ গ্রাহ্য করা হয়নি। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আগে থেকে যদি এলাকাবাসীর সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সখ্য গড়ে উঠতো, তারা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবী যথাসময়ে পূরণ হতে দেখতে পেতো, তাহলে তাদের সঙ্গে সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা হয়তো ঘটতো না। তারা আরো মনে করেন, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সংঘটিত হতাহতের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে গত শনিবারের শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনাও হয়তো ঘটতো না। তদন্ত ও বিচারের কী হয়েছে, জানা না গেলেও , ২০১৬ ও ২০১৭ সালে গুলিতে নিহতদের পরিবার-পরিজনের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও চাকরির নিশ্চয়তা দিয়েও কথা রাখেনি এস আলম গ্রুপ। অনেক এলাকাবাসী জমির ন্যায্য দামের আশায় এখনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।

এই যে এতগুলো মানুষ হতাহত হলো, এই যে অনাচার-অবিচার ও জুলুম চলছে দীর্ঘদিন ধরে, তার কি বিচার পাওয়া যাবে না, প্রতিকার মিলবে না? এস আলম গ্রুপ ক্ষমতাশালী ও বিত্তশালী বলেই কি সাত খুন মাপ? আইন সে কথা বলেনা। আইন বলে, তার চোখে সবাই সমান। ধনী ও দরিদ্র বলে ফারাক নেই। এই নিরীখে আমরা বলবো, বাঁশখালী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে এ যাবৎ যা কিছু হয়েছে অর্থাৎ যত মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটেছে, যত অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনা হয়েছে, তার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে। তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের যথোচিত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার দাপট ও প্রতিপত্তিকে নয়, আইনের শাসনকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। পুলিশের দায়িত্ব মানুষের জীবন, সম্পদ ও শান্তি-শৃংখলা সুরক্ষা করা। যে কোনো উপলক্ষ বা অজুহাতে মানুষের ওপর গুলি চালানো তার কাজ নয়। মানুষ মারা সহজ; বাঁচানো বা রক্ষা করা কঠিন। পুলিশকে যে কোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। তাতে অনেক অঘটন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x