হেফাজত এখন কার, কে হেফাজতের? এসব প্রশ্নের উত্তর বড়ই জটিল

Posted on by

নিউজ লাইফ লন্ডন ডেস্ক : হেফাজত এখন গরীবের সুন্দরী বউ!
অনেক দিন থেকে কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকিঝুকি করছে, তা হলো- হেফাজত এখন কার? কে হেফাজতের? এসব প্রশ্নের উত্তর বড়ই জটিল, বেশ গোলমেলে।
২৬ মার্চ কেনো হেফাজত সংঘর্ষে জড়ালো? কাদের নেতৃত্বে জড়ালো? হেফাজতের নেতৃত্ব এখন কার হাতে? হেফাজতে ইসলামসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক অরাজনৈতিক সংগঠন ২৬ মার্চের কর্মসূচি স্থগিত রেখেছিল। পূর্ব ঘোষিত সকল কর্মসূচি তারা তুলে নিয়েছিল। তবু কেনো বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষ হলো? বায়তুল মোকাররমে কারা জড় হয়েছিল? তারা কী সাধারণ মুসল্লি ছিল, নাকী হেফাজতের কর্মী ছিল?
হেফাজতের কর্মীদের তো বায়তুল মোকাররমে জড় হওয়ার কথা নয়। তাদের তো কোনো কর্মসূচি ছিল না। অথচ বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কেনো হেফাজতের দূর্গ হাটহাজারিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লো? ওই বিক্ষোভের নেতৃত্ব কে দিয়েছিল, কারা দিয়েছিল? বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের সাথে হাটহাজারির সম্পর্ক কী ছিল?
হাটহাজারির বিক্ষোভ, সংঘর্ষ কেনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছড়িয়ে পড়লো? সেখানে কে নেতৃত্ব দিয়েছিল? তারা কেনো থানায় হামলা করলো? কেনো রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দিলো? কেনো লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলানো দরকার। গোজামিল দিয়ে বা ঢাকাঢাকি না করে সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা দরকার। পক্ষপাতহীন তদন্ত হওয়া দরকার। সরকারপক্ষের পাশাপাশি হেফাজতের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা দরকার। প্রয়োজনে কওমি আলেমদের সর্বোচ্চ কমিটি করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা দরকার।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের প্রতিবাদ দেশের সব ইসলামপন্থী সংগঠন জানিয়েছে। বামপন্থীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জানিয়েছে। হেফাজত ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলন করে তাদের গঠনমূলক বক্তব্য জাতীর সামনে তুলে ধরেছে। ২৬ তারিখের সকল কর্মসূচি স্থগিত করেছে। এটাই তো যথেষ্ট এবং স্মার্ট ছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তির সকল অনুষ্ঠান স্থগিত করা বা বর্জন করাও তো প্রতিবাদের একটা ভাষা ছিল। এর বাইরে সংগঠনগুলো চাইলে বড়জোর একটা কালোপতাকা মিছিল করতে পারতো। কিন্তু তারা কেনো সংঘর্ষে জড়ালো? এর পেছনে মূলত কারা? তাদের উদ্দেশ্য কী? ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারি বা বায়তুল মোকাররমে যে ধরণের হামলা, সংঘর্ষ হলো এগুলো তো মাদরাসার ছাত্রদের করার কথা নয়। বাংলাদেশের কওমিপন্থীরা তো এ ধরণের হামলা, সংঘর্ষ করে না। এবার কেনো করলো? কারা করালো?
২৬ তারিখের সংঘর্ষের প্রতিবাদে হেফাজত কেনো হুট করে হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষনা করতে গেলো? হরতার সফল করতে তাদের কী প্রস্তুতি ছিল? সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল করার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা কী তাদের আছে? নাকী মানুষের ধর্মীয় আবেগই তাদের পুঁজি? বাংলাদেশের হরতাল কেমন হয়, বিশেষ করে ফ্যাসিবাদি আওয়ামীলীগ সরকারের আমলের হরতাল কেমন হয়! তা কী হেফাজতের নেতারা জানেন না? সংগঠনের প্রতি, নেতাকর্মীদের প্রতি তাদের নিয়ন্ত্রণ কতোটা তারা কী সে খবর রাখেন না? তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে আজ যে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেলো, এতগুলো মানুষ আহত হলো, পঙ্গুত্ব বরণ করলো, এর দায় কে নেবে? কে তাদের ক্ষতিপুরণ দেবে?
হেফাজতে ইসলামের কী সেই সক্ষমতা আছে- সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করবে? নেই। শুধু যে নেই তা নয়, তারা নিজেরাও আহত নিহতদের ক্ষতিপুরণ দেবে না, দিতে পারবে না, চেষ্টাও করবে না। শাপলায় নিহতদের সঠিক তালিকা আজ পর্যন্ত হেফাজত প্রকাশ করতে পারেনি। এতটুকু সক্ষমতা যাদের নেই তারা কেনো নতুন করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে, হামলার মুখে ঠেলে দিলো? তারা মূলত কাদের স্বার্থ উদ্ধার করলো?
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর ছিল শতভাগ রাজনৈতিক। এর সাথে আওয়ামীলীগের ক্ষমতা, ভূরাজনীতি, ভারতের নির্বাচন, কূটনীতি, অর্থনীতি অনেক কিছু জড়িত। হেফাজতের মতো অরাজনৈতিক সংগঠন কেনো এসবের মধ্যে ঢুকতে গেলো? কারা তাদের ঢুকালো?
জাগ্রত কবি মুহিব খান আগেই সতর্ক করেছিলেন, কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেয়ার জন্য। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর শুধু বাংলাদেশ আর ভারতের বিষয় নয়। এর আন্তর্জাতি তাৎপর্য আছে। তবু কেনো হেফাজতের নেতারা এসব বিষয় আমলে নিলেন না?
২৬/২৭ মার্চ তারিখের সংঘর্ষ থেকে পরিস্কার বোঝা যায় এখনের হেফাজত আর আল্লামা শফির হেফাজত এক নয়। এখনের হেফাজতের কোনো সঠিক নেতৃত্ব নেই। চেইন অব কমান্ড নেই। যার যেভাবে ইচ্ছা হেফাজতকে ব্যবহার করছে। সরকার তার প্রয়োজনে হেফাজতকে ব্যবহার করছে। বিএনপি জামায়াত তাদের মতো করে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ইসলামপন্থী চুটকে রাজনৈতিক নেতারা তাদের মতো করে ব্যবহার করছে। তাদের অপব্যবহারের বলি হচ্ছে মাদরাসার ছাত্রসহ ইসলামপন্থী তৌহিদি জনতা। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের নিয়মতান্ত্রিক ইসলামপন্থী রাজনীতি।
পৃথিবীর কোনো ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন দীর্ঘায়িত হয় না। ইস্যু ফুরিয়ে গেলে বা দাবী অর্জন হলে তা এমনিতেই থেমে যায়। যেমন থেমে গিয়েছে শাহবাগিদের আন্দোলন। সময়ের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা আন্দোলন সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যায়। আবার প্রয়োজন হলে নতুন করে দানা বাঁধে। হেফাজতের বেলায় এমনটা যারা হতে দিচ্ছেন না তারা মূলত রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া বা ব্যার্থ মানুষ। তারা নিজেদের দল, সংগঠন রেখে হেফাজতকে পুঁজি করে পুজার পাত্র হওয়ার চেষ্টা করছেন। যা চরম রকমের ভুল। তারা চরম রকমের ভুলের মধ্যে রয়েছেন। তারা হেফাজতকে ব্যবহার করে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছেন সেটা যদি নিজেদের দল বা সংগঠন থেকে করতেন তবে তার একটা ভবিষ্যৎ হতো। এখন আসলে কিছুই হচ্ছে না। তারা নিজেরা যেমন দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, একই ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন দেশের নিয়মতান্ত্রিক ইসলামপন্থী রাজনীতির।
হেফাজতের কোনো কোনো নেতাকর্মীকে দেখা যায় ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে- তারা (চরমোনাই পীরের দল) কেনো হেফাজতের কর্মসূচি সফল করতে এগিয়ে আসে না! একটু সচেতন ভাবে ভাবলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- তারা কেনো হেফাজতের হঠকারী কর্মসূচি সফল করতে আসবে? কেনো সমর্থন করবে? এ জাতীয় আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী? উদ্দেশ্য কী? দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্য কী? এ জাতীয় আন্দোলনের বিষয়ে ইতিহাস কী বলে?
তাছাড়া আপনারা কেনো ইসলামি আন্দোলনের সমর্থন বা সহযোগীতা আশা করবেন? আপনাদের রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বিএনপির সাথে। কই, তাদের সমর্থন তো আদায় করতে পারলেন না! বরং বিএনপি ঘটা করে জানিয়ে দিলো- আপনাদের সাথে তারা নেই। তাহলে কীসের রাজনীতি করেন? কাদের সাথে রাজনীতি করেন? আপনাদেরও তো রাজনৈতিক দল আছে। সেগুলো কোথায়? তাদেরও তো দৃশ্যনাম হতে দেখলাম না! এর দ্বারা দেশের মানুষ কী বুঝবে? কী ধরে নেবে?
আওয়ামীলীগের চাপ এবং রাজনৈতিক ভুল বহন করার খেসারত দিচ্ছে দেশের বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াত। তারা অনেক দিন থেকে মাঠে নেই। দৃশ্যমান হতে পারছে না। ইসলামপন্থীদের এই ফাঁকা মাঠ অন্য কাউকে ব্যাবহারের জন্য ছেড়ে দেয়নি ইসলামি আন্দোলন। তারা মাঠ ধরে রেখেছে। দেশের ইসলামপন্থী জনতাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। তারা এখন দেশের প্রধান ইসলামপন্থী দলে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। তাদের এই অর্জনের কী কোনো মূল্য নেই? কোনো গুরুত্ব নেই? তাদের নেতৃত্বের, অভিজ্ঞতার, বিচক্ষণতার, মেধার কোনো তাতপর্য নেই? হাওয়ায় ভেসে তারা এত পথ এসেছে?
একবার ভাবুন তো তারাও যদি আপনাদের বুদ্ধিতে চলতো তবে কী দেশে কোনো স্বতন্ত্র ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারা থাকতো? আওয়ামী ফ্যাদিবাদের এই ভয়াবহ সময়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারতো? দেশের ইসলামপপন্থীদের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে পারতো? পারতো না। তাদেরও আওয়ামীলীগ বিএনপিতে বিলিন হয়ে যেতে হতো। তাদেরও নাড়া-কুটার মতো হেফাজকে আকড়ে ধরে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে হতো।
একটু খারাপ ভাষায় বলি- হেফাজতকে বলাৎকার করে নিজেদের পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে হতো, যেমনটা দিচ্ছেন অন্যান্য ইসলামপন্থী রাজনীতির নেতারা। এখনো সময় আছে হেফাজতকে দেশের অরাজনৈতিক আলেমদের হাতে ছেড়ে দিন। তাতে হেফাজতের গুরুত্ব বাড়বে। হাটহাজারি থেকে হেফাজত নেতা যখন একটা কথা বলবেন তখন গোটা রাষ্ট্র কেঁপে উঠবে। দেশের সরকার, অসরকার সবাই ভাবতে বাধ্য হবে।
ছোট হোক, বড় হোক নিজেদের ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নামুন। রাজনীতি করুন। মনোযোগ, মেধা, বিচক্ষণতা ব্যায় করলে রাতারাতি না হোক, দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য আপনাদের ঘরে উঠবে। আওয়ামীলীগ বিএনপিতে বিলিন হয়ে কী লাভ হয়েছে আপনাদের? এখন নিজের অস্তিত্বই খুঁজে পান না। হেফাজতকে ব্যাবহার করতে হয়। এসব নিয়ে একটু ভাবুন। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। আমি বিশ্বাস করি নিজেরাই সমাধান খুঁজে পাবেন।
পরিশেষে আবারো বলি- ২৬/২৭ তারিখের সংঘর্ষ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করুন। এমনও হতে পারে হেফাজতের মধ্যে ঘাঁপটি মেরে আছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট। তারা পরিকল্পিত ভাবে ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের পারপাস সার্ফ করেছে। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থার বেপারেও তদন্ত হওয়া উচিত। তারাও ভারতী গোয়েন্দা দ্বারা কতোটা প্রভাবিত হয়ে গুলি চালিয়েছে তা উন্মোচিত হওয়া দরকার।
.পলাশ রহমান (ইটালী থেকে)।

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x