ফের চার্জশিটভুক্ত আসামি কার্টুনিস্ট কিশোরকে ওই মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার পুলিশি আবেদন নিয়ে প্রশ্ন

Posted on by

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর পর নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলছে, চলছে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। সেই মামলায় কারাবন্দি কার্টুনিস্ট আহমদ কবির কিশোরসহ তিনজনকে আসামি করে চার্জশিট দিয়েছিল রমনা থানা পুলিশ। ফের চার্জশিটভুক্ত আসামি কিশোরকে ওই মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার পুলিশি আবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার আইনজীবীসহ বিশিষ্টজন। যদিও রিমান্ড আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।

কিশোরের অনুপস্থিতিতেই গতকাল রোববার রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হয়। পরে ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম তার রিমান্ড নামঞ্জুর করেন। কিশোরের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এদিন আসামিকে হাজির না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তাকে র‌্যাব নির্যাতন করেছে জানিয়ে আদালতের কাছে সংশ্নিষ্টদের শাস্তি দাবি করেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আপনারা মহানগর দায়রা জজ আদালতে দরখাস্ত দাখিল করলে ওই আদালতই এই মামলার নথি তলবপূর্বক তাকে হাজিরের জন্য পিডব্লিউ ইস্যু করতে পারবেন।’

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া সমকালকে বলেন, গত ১১ জানুয়ারি পুলিশ এই মামলায় চার্জশিট দেয়। সেই চার্জশিট আদালত গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে, অধিকতর তদন্ত মানে পুনঃতদন্ত নয়। কারণ চার্জশিট দেওয়ার পর নতুন করে তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। আর পুলিশ যদি মামলা-সংক্রান্ত নতুন কোনো তথ্য পায়, সেটাই কেবল অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে পারে এবং চার্জশিটে সম্পূরক হিসেবে যোগ করতে পারে। কিন্তু কোনো আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার পর আর কোনো তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদ আইনগতভাবে চলে না। এ কারণে চার্জশিটভুক্ত আসামিদের বিষয়ে কোনো রিমান্ড আবেদনেরও বিধান নেই। এ ছাড়া কারও রিমান্ড চাইতে হলে অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করতে হয়। কার্টুনিস্ট কিশোরকে রোববার আদালতে হাজিরও করা হয়নি। এক্ষেত্রে পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করতে পারে না। তার পরও পুলিশ তার অনুপস্থিতিতেই এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে রিমান্ড চেয়েছে।

কার্টুনিস্ট কিশোরের জন্য জামিনের আবেদন করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার জামিনের জন্য প্রায় এক মাস আগে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছে। উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন থাকলে নিম্ন আদালতে জামিন চাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ কারণেই রোববার নিম্ন আদালতে জামিন চাওয়া হয়নি। সোমবার (আজ) হাইকোর্টে কিশোরের জামিনের আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে বলেও তিনি জানান। জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, কারাগারে কিশোর অসুস্থ। গ্রেপ্তারের পর তাকে নির্যাতনের চিহ্ন আছে। তিনি বলেন, ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ অনুযায়ী শিগগিরিই সেশন জজ আদালতে মামলা করা হবে। ওই মামলা করার সঙ্গে আদালত সংশ্নিষ্ট আইনের বিধান মোতাবেক ভিকটিমের জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এখন চিকিৎসার জন্য পৃথক কোনো আবেদন করা হয়নি। হাইকোর্টে জামিন শুনানির পর পরই সেশন জজ আদালতে মামলার জন্য যাওয়া হবে।
কার্টুনিস্ট কিশোর বর্তমানে কাশিমপুর-২ কারাগারে আছেন। গতকাল শুনানির দিন ধার্য থাকলেও কেন তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি- এমন প্রশ্নে কারাগারের জেল সুপার আব্দুল জলিল সমকালকে বলেন, আদালত থেকেই বলা হয়েছিল এই আসামিকে সশরীরে হাজির করার দরকার নেই। কাস্টডি ওয়ারেন্ট (সিডব্লিউ) নিয়ে তাকে আদালতে হাজির করানোর কথা বলা হয়। তাই কাস্টডি ওয়ারেন্ট বুঝে নেয় পুলিশ। আসামি কিশোরকে তাদের কাছে দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। বিভিন্ন সময় অন্য আসামিদের বেলায়ও সিডব্লিউ নিয়ে আদালতে শুনানি চলে।

কেন কিশোরের ফের রিমান্ড আবেদন করার প্রয়োজন হলো- এমন প্রশ্নে পুলিশের ডিসি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, আদালতের নির্দেশে এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে সাইবার সিকিউরিটি বিভাগ। আগে তদন্ত করেছিল রমনা থানা পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে আগের তদন্ত কর্মকর্তা কাউকে প্রথম চার্জশিটে অভিযুক্ত করলেও ফের তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতি চাইতে পারেন। রিমান্ড দেওয়া বা না দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের।

কার্টুনিস্ট কিশোরের ভাই সাংবাদিক আহসান কবির সমকালকে বলেন, তার ভাই খুবই অসুস্থ। তিনি ঠিকমতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। তিনি চোখেও স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না। কানে পুঁজ জমে আছে। তার বিরুদ্ধে একবার চার্জশিট হয়েছে। এ ছাড়া তাকে জেল কর্তৃপক্ষ আদালতে হাজির করতেও ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন অত্যন্ত অমানবিবক এবং নজিরবিহীন। নিজের মত প্রকাশের কারণে তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর বর্তমানে কিশোরের অবস্থা নিয়ে পরিবার খুবই উদ্বিগ্ন।
বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া :জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান সমকালকে বলেছেন, যখন সরকার অনেক ভালো কাজ করছে, দেশের অনেক বড় অর্জনের খবর আসছে, তখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর এ ধরনের আচরণ সরকারের সেই সব কাজ এবং অর্জনকেই কালিমালিপ্ত করছে। এই সত্যটা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের অবশ্যই বুঝতে হবে।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ এবং সুপারিশ কোনোটিই সরকার আমলে নেয়নি। সম্পাদক পরিষদ বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এত বেশি ক্ষমতা দিয়েছে যে, তারা এখন নিজেদের সীমাহীন ক্ষমতাবান মনে করছে, কিশোরের ঘটনা তারই প্রমাণ। লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর এ আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এখন মানুষ সোচ্চার হয়েছে। এর মধ্যেও পুলিশ যখন এ আইনের অপব্যবহার অব্যাহত রাখে, তখন প্রমাণ হয়, এ আইন ব্যবহার করে পুলিশ বাংলাদেশের মানুষের মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে উঠেপড়ে লেগেছে। কিশোরের রিমান্ড চাওয়ার মধ্য দিয়ে পুলিশের আচরণটা বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ারই নজির।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের নিরাপত্তায় ব্যবহূত হচ্ছে না। বরং এই আইন নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা তীব্র করে তুলেছে। আইনটি শুধু ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা বন্ধের কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ আইন প্রণয়নের লক্ষ্যই ছিল তাই। শুরুতে সেই শঙ্কা নাগরিক সমাজের ছিল, এটা এখন বাস্তব। পুলিশ জনগণের আবেগ, অনুভূতি, ক্ষোভ কোনো কিছুকেই আমলে নেয় না- কিশোরের রিমান্ড চাওয়ার মধ্য দিয়ে সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে।
সমকাল

Developed by: TechLoge

x