‘৩০ লাখ টাকায় মেয়েকে হত্যার অনুমতি দেয় বাবা-মা’

Posted on by

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে ইলমাকে হত্যার অনুমতি দিয়েছিলেন বাবা আবদুল মোতালেব। বিষয়টি জানত ইলমার মা-ও।সোমবার (৯ মার্চ) নরসিংদীর বাহেরচরে চাঞ্চল্যকর ইলমা হত্যার পলাতক আসামি মাসুম মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এর আগে ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ নরসিংদীর বাহেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ইলমা নৃশংসভাবে খুন হয়। পরে ওই ঘটনায় ইলমার বাবা আবদুল মোতালেব বাদী হয়ে নরসিংদী মডেল থানায় মামলা করেন।সিআইডির সম্মেলনকক্ষে সোমবার সংবাদ সম্মেলনকালে উপমহাপরিদর্শক (সংঘবদ্ধ অপরাধ বিভাগ) ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, নিজের বাবার লোভের বলি হয়েছিল ইলমা। ওই সময় বাহেরচরে শাহজাহান ভূঁইয়া ও সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুর নেতৃত্বে এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুটি দলের দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বের জেরে শাহজাহান ভূঁইয়ার লোকজন প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু ইলমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।আর হত্যার বিনিময় হিসাবে ইলমার বাবা আবদুল মোতালেবকে ৩০ লাখ টাকা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ফলে টাকার লোভে মোতালেব নিজের মেয়েকে হত্যার অনুমতি দেয়। রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত মোতালেব ৪ লাখ টাকাও পেয়েছেন।

প্রধান আসামি মাসুম মিয়া নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন। মামলার প্রধান আসামি মাসুম সম্পর্কে ইলমার ফুফাতো ভাই।জানা যায়, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরার নেতৃত্বে একটি দল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইলমার বাবা আবদুল মোতালেব, ফুফাতো ভাই মাসুম মিয়া, গ্রুপ লিডার শাহজাহান ভূঁইয়া, মা মঙ্গলী বেগমসহ মো. বাতেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। একপর্যায়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর মাসুম মিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাসুম জানায়, ২০১৫ সালের ১ মার্চ ইলমাকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। বর্বর এই হত্যার ছক আঁকতে ওই রাতে ১৩ জনের উপস্থিতিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিশু সন্তানের বিনিময়ে ৩০ লাখ টাকার টোপ দেওয়া হয়। আর এতেই সন্তানের বলি দিতে রাজি হয়ে যান ইলমার বাবা-মা।

এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই বছরের ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ইলমার দুলাভাই বাবুল বাড়ির পাশের নূরার দোকান থেকে ইলমাকে কিছু জিনিসপত্র কিনতে পাঠায়। ওই সময় বাড়ি ফেরার পথে তার দুলাভাই বাবুল ও ফুফাতো ভাই মাসুমের নেতৃত্বে সাত থেকে আটজন ইলমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে ইট আর মুগুর দিয়ে ইলমার মাথা থেঁতলে ও গলা টিপে তাকে হত্যা করা হয়।ওই হত্যাকাণ্ড পাশে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে অবলোকন করেন ইলমার বাবা। সিআইডি জানিয়েছে, হত্যার এই পরিকল্পনা সম্পর্কে ইলমার মা-ও জানতেন।মাসুম মিয়া আদালতকে জানায়, ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ মেয়েকে হত্যার মূল আসামিদের বাদ দিয়ে ইলমার বাবা মোতালেব বাদী হয়ে বিরোধীপক্ষ ‘বাচ্চু’ গ্রুপের বিলকিস, খোরশেদ, নাসুসহ অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে মোতালেব হত্যাকাণ্ডের আগে টাকা দাবি করেছিলেন। আর পরে ওই পুরো টাকাও পাননি তিনি।

প্রধান আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে সন্তান হত্যার দায় মা–বাবার ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক- এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইডির উপমহাপরিদর্শক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ইলমার বাবা-মা মূল আসামিদের নাম এজাহারে উল্লেখ করেননি। এমনকি তদন্তের সময় ইলমার বাবা একেক সময় একেকজনের নাম এজাহারভুক্ত করার আবদার নিয়ে এসেছেন। তারা সন্তান হত্যার বিচার না চেয়ে উল্টো বারবার আসামির নাম বদলানোর অনুরোধ নিয়ে পুলিশের কাছে এসেছেন। এছাড়া ইলমার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে যেখানে যেখানে আঘাতের কথা বলা হয়েছে, মাসুম নিজের জবানবন্দিতে ঠিক সেই জায়গাগুলোর কথাই উল্লেখ করেছেন।এ দিকে, অনুসন্ধানের বরাতে সিআইডি জানায়, বাহেরচরে শাহজাহান ভূঁইয়া ও সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুর নেতৃত্বে দুটি দলের মধ্যে এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। শাহজাহান গ্রুপের সদস্য ও ইলমার ফুফাতো ভাই মাসুমের সঙ্গে বাচ্চুপক্ষের সদস্য ও তোফাজ্জলের মেয়ে তানিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে বিয়ে করতে তানিয়াকে তোলা হয়েছিল মাসুমের ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। ওই সময় তানিয়ার বাবা দলবল নিয়ে সেখান থেকে তানিয়াকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান।পরবর্তীকালে ওই ঘটনায় তানিয়ার বাবা বাদী হয়ে মাসুম, তার ভাই খসরু ও ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। সবশেষে ওই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে বাচ্চু গ্রুপের সদস্যদের ক্ষতিসাধন করতে শাহজাহানের অনুসারীরা ইলমাকে হত্যার এই ছক আঁকে।

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x