রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত মুক্তিযোদ্ধা

Posted on by

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা প্রণব কুমার ধর (পি কে ধর রুনু) মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে পরিচিত। তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করলে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত করার অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় গত বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ মানববন্ধন করে এর প্রতিবাদ জানায়।স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ও প্রণব কুমার ধরের স্বজনরা জানায়, গত ১২ জানুয়ারি (রবিবার) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাতকানিয়া উপজেলার চরতি ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকায় নিজ বাড়িতে প্রণব কুমার ধর মৃত্যুবরণ করেন। প্রণব ধরের মৃত্যুর পরদিন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবু তাহের এলএমজি নিজেকে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দাবি করে তার স্বাক্ষরিত ও ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষরসহ গেজেট নং উল্লেখ করে রুনু ধরকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত না করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রশাসকের কাছে আবেদন জানান।তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডের কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এর পুরো দায়িত্বভার থাকে ইউএনও এর উপর। সে দিক থেকে এ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান প্রশাসক ইউএনও।পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অনেকেরই অভিযোগ, ইউএনও আবু তাহেরের দেওয়া আবেদনের সত্যতা যাচাই না করেই প্রণব ধরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা থেকে বিরত থাকেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হতে থাকলে সাতকানিয়াসহ পুরো চট্টগ্রামে শুরু হয় তোলপাড়।

জানা যায়, আবু তাহের এলএমজি স্বাক্ষরিত আবেদনে লেখা রয়েছে রুনু ধর, প্রণব কুমার ধর নয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাও নন। তাই তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত না করার আবেদন জানাই। আবেদনে উল্লেখ রয়েছে- ২২/১১/২০১৫ ইং প্রকাশিত গেজেটে তার নাম ৩০১২ নামীয় তালিকাভুক্ত হয়। গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তার নামে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে কোন সাময়িক সনদপত্র পাওয়া যায়নি। ঐ ব্যক্তিকে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কোনভাবেই চিনেন না।তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বেসামরিক গেজেটে দেখা যায়, প্রণব কুমার ধর, পিতা মৃত পরিমল কুমার ধর, গ্রাম তুলাতলি, ইউনিয়ন চরতি, উপজেলা সাতকানিয়া, জেলা চট্টগ্রাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে গেজেট নং- ৩০১২ লেখা রয়েছে। এছাড়াও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে সামনের কাতারে বসা এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা নেওয়ার ছবি দেখা গেছে।

গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে রুনু ধরকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না দেওয়ার প্রতিবাদী মানববন্ধন থেকে দক্ষিণ জেলা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হাসান বলেন, রুনু দা খুবই সাদাসিধে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তাকে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে আগামীতে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে।এবিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রুনু দাকে আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই জানি। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রথম সারিতে তাকে আমরা দেখেছি। যাদের অবহেলায় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার বিষয়টি মর্মাহত হওয়ার পাশাপাশি আমাদের জন্য অপমানজনকও বটে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয়। জামায়াত শিবির ও স্বাধীনতা বিরোধীদের তাণ্ডব মোকাবেলা তাকে সামনে পেয়েছি। এছাড়াও রাজনৈতিক যে কোন সংকটে রুনু দা নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। আর রুনু দাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত না করার জন্য যারা অভিযোগ দিয়েছেন বলে শুনেছি, তাদের কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগেই। দরখাস্তে দেওয়া তথ্য উপাত্ত তদন্ত করা উচিত ছিল ইউএনওর ।রুনু ধরের আপন ছোট ভাই সুশান্ত ধর অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাই মুক্তিযুদ্ধ করেছে কোন কিছু পাওয়ার লোভে নয়। অন্তত মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া উচিত ছিল। সম্মাননা দেয় নাই, তাতে কোন দুঃখ নাই। কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে বিতর্কিত করে আমাদের শোককে আরও দিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।তবে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবু তাহের এলএমজিকে মুঠো ফোনে কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেনি।এবিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘রুনু ধর আসলে প্রণব কুমার ধর নয় এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধও নন’ মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের এলএমজিসহ ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষরিত এমন একটি লিখিত অভিযোগ আমি পেয়েছি। এছাড়া মৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাকে কেউ জানায়নি। তাই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া থেকে বিরত ছিলাম।

Leave a Reply

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x