তাফিদাকে বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে আদালতের ঐতিহাসিক রায়

Posted on by

৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তাফিদা রাকিবকে দিতে হবে বেঁচে থাকার সুযোগ। খোলা যাবেনা তাঁর লাইফ সাপোর্ট, চিকিৎসার জন্য ইতালি যেতে সৃষ্টি করা যাবে না কোন প্রতিবন্ধকতা।

রায় ঘোষণার পর আদালতের সামনে তাফিদার মা-বাবা। ছবি: সিটিজেন গো

বৃহস্পতিবার লন্ডনের উচ্চ আদালতের বিচারক রয়েল লন্ডন হাসপাতালকে এমন নির্দেশ দিয়ে তাফিদার বেঁচে থাকার পক্ষে ঘোষণা করেছেন তাঁর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।

তাফিদাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার পক্ষে আদালতের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিচারক মি: ম্যাকডোনাল্ড তাঁর রায়ে বলেন, ‘ইইউ ভুক্ত অন্য একটি রাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা গ্রহনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারেনা। আমি আশা করি এই স্থানান্তর অনতিবিলম্বে ঘটবে’। তিনি বলেন, ‘এনএইচএস ট্রাস্ট, ইতালির গ্যাসলিনী হাসপাতাল বা অন্য যেকোনও হাসপাতালকে তাফিদার জীবিতকালীন চিকিৎসা সরবরাহ করতে হবে।’

রায় ঘোষনার পর সিটিজেন গো ক্যাম্পেইনার ক্যারলিন ফেরো কে জড়িয়ে ধরেছেন তাফিদার নানি। ছবি: সিটিজেন গো

বিচারক তাঁর রায়ে আরও বলেন, ‘চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের অবশ্যই নৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলোর সাথে ভারসাম্য রেখে প্রতিটি ইনডিভিজুয়েল কেইসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

রায়ের উপসংহারে বিচারক মি: ম্যাকডোনাল্ড বলেন, চিকিৎসার জন্য ইতালিতে নিয়ে যাওয়া তাফিদার মা-বাবার পছন্দ। সন্তানের জীবন ও তাঁর ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা তাদের অভিভাবকী দায়িত্ব। এই দায়িত্ব চর্চা অবশ্যই তারা করবেন।’

এদিকে, উচ্চ আদালতের রায় বিরুদ্ধে যাওয়ার পর এনএইচএস ট্রাষ্ট এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে কি না তা জানা যায়নি। 

আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন তাফিদার মা সেলিনা রাকিব। ছবি: সিটিজেন গো

রায় ঘোষণার পর তাফিদার আইনজীবী ব্যারিস্টার ডেভিড লক কিউসি রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, একটা অনেক বড় যন্ত্রণা থেকে তাঁর মা বাবা মুক্তি পেলেন। এদিকে, হাসপাতালের আইনজীবী ব্যারিস্টার কেটি গলপ কিউসি জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হয়তো রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও করতে পারে। তবে এখনো কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। 

অবশ্য রায় ঘোষণার আগেই বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাফিদার পক্ষে আন্দোলনরত আন্তর্জাতিক স্বেচ্চাসেবী সংস্থা ‘সিটিজেন গো’ আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে রায় বিপক্ষে গেলে এনএইচএস যাতে আর আপিলে না যায় তাঁর দাবী জানানো হয়। বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত এই মানব বন্ধনে ‘সিটিজেন গো’র সমন্বয়ক ক্যারোলিন ফেরো বলেন, ‘আমরা ছোট্ট মায়াবী শিশু তাফিদার বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় লড়াই করছি। এ লড়াই শুধু তাফিদার মা-বাবার সন্তান রক্ষার লড়াই নয়, এ লড়াই চিকিৎসক কর্তৃক জীবন হরণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াই। এই ইস্যু শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষার ইস্যু নয়, এটি হিউম্যান ডিগনিটি রক্ষার ইস্যু’। ক্যারলিন বলেন, আমাদের এই আন্দোলন শুধুমাত্র তাফিদার অধিকার রক্ষার আন্দোলন নয়, এ আন্দোলন আমাদের বর্তমান ও অনাগত প্রজন্মের স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রক্ষার লড়াই। তিনি বলেন, বিষয়টি এখন আদালতের এখতিয়ারাধীন। লাইফ সাপোর্ট খুলে তাফিদার জীবন হরণ না ইতালিতে চিকিৎসা গ্রহনের সুযোগ- বৃহস্পতিবার আদালত এ সিদ্ধান্ত জানাবেন। সিদ্ধান্ত তাফিদার পক্ষে বা বিপক্ষে যেতে পারে। যদি পক্ষে যায় তাহলে এনএইচএস যেন এই ইস্যুতে আর আপিলে না যায়, তাদের কাছে এটিই আমাদের প্রত্যাশা’।

বুধবার পূর্ব লন্ডনের শহীদ মিনারে ‘সিটিজেন গো’র মানববন্ধন।

তাফিদাকে ইতালিতে যেতে দেয়ার সুযোগের দাবি সম্বলিত প্লাকার্ড হাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন মানববন্ধনে। মেডিসিন কনসালটেন্ট ড. ফিলিপ হাওয়ার্ডও বক্তৃতা দেন মানববন্ধনে। লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার অনুমতি দিতে তাফিদার পরিবারের প্রতি এনএইচএসের চাপ প্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে ড. ফিলিপ হাওয়ার্ড বলেন, একজন রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু জীবন হরণের অনুমতির জন্য আদালতে যান সংশ্নিষ্টরা, আমার দীর্ঘ জীবনের চিকিৎসা পেশায় এমন ঘটনার মুখোমুখি কখনও হইনি। জীবন বাঁচানোর চেষ্টা না করে হরণের জন্য চাপ প্রয়োগ অমানবিক, সভ্যতার কলঙ্ক। স্থানীয় কাউন্সিলার ও কমিউনিটি নেতারাও বক্তব্য রাখেন মানববন্ধনে।

উল্লেখ্য, ৫ বছর বয়সের তাফিদা রাকিব চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে মাথায় ব্যথা অনুভব করে। এর একটু পরেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাকে স্থানীয় নিউহ্যাম হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বলেন তাফিদার ব্রেইন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এরপর তার মাথায় অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সে কোমায় রয়েছে। বর্তমানে তাফিদা রয়েল লন্ডন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ডাক্তাররা বলেছিলেন, তাফিদার আর সুস্থ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, তার জন্যে এখন উত্তম হচ্ছে তাকে শান্তিতে মরতে দেয়া। কিন্তু তাফিদার মা সেলিনা রাকিব বলে আসছেন, তাঁর মেয়ে এখন আগের চেয়ে ভালো, এবং সে দিন দিন সুস্থ হচ্ছে। তিনি জানান, তাকে একজন ভালো নিউরোলজিস্ট বলেছিলেন, তাফিদার শারীরীক অবস্থা পুরোপরি বুঝার জন্যে আরও সময় লাগবে। তাফিদার পরিবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে ইতালির জেনোয়ার গ্যাসলিনি চিলড্রেনস হাসপাতালে স্থানান্তর করতে চায়। কিন্তু তাফিদার রয়েল লন্ডন হাসপাতালের ডাক্তাররা তাকে ইতালির হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছেলেন না। তারা বার বার বলছিলেন তাফিদার ব্রেইন আর সুস্থ হবে না। বরং তারা তাফিদার লাইফ সাপোর্ট খুলে নিতে চেয়েছিলেন। লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়ার মানে হচ্ছে তাফিদার জীবন শেষ বলে ঘোষণা করা।

কিন্তু তাফিদার মা ডাক্তারদের লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়ার অনুমতি দেননি। ডাক্তাররা লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়ার অনুমতি আদায়ের জন্যে আদালতে মামলা করেন। এদিকে, তাফিদার মা সেলিনা বেগমও তার মেয়েকে ইতালির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুমতির জন্যে আদালতের শরণাপন্ন হন। ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতে যুক্তি তর্ক শেষ হয়। অবশেষে ৩ অক্টোবর, বুধবার ব্রিটেনের উচ্চ আদালত তাফিদাকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

তাফিদার গ্রামের বাড়ি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলায়। তার পিতা মোহাম্মদ রাকিব একজন কন্সট্রাকশন কনসালটেন্ট এবং মাতা সেলিনা বেগম একজন আইনজীবী।

এদিকে, আদালতের রায় তাফিদার পক্ষে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে এ ইস্যুতে যারা সোচ্চার ছিলেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ‘সিটিজেন গো’।

Leave a Reply

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x