বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়ত, রাষ্ট্রবিহীন মুসলিম সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা : লন্ডন সেমিনারে বক্তারা (ভিডিও সহ )

Posted on by

নিউজ লাইফ লন্ডন ডেস্ক : বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়ত, রাষ্ট্রবিহীন মুসলিম সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা। পালাক্রমে রোহিঙ্গারা ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬-২০১৭ সালে মিয়ানমার সরকারের সামরিক নির্যাতন এবং দমনের সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর চালানো দমন ও নির্যাতনকে জাতিগত নির্মূলতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। যেখানে গণহত্যার ও মানবতা লঙ্ঘনের জঘন্যতম নজির স্থাপিত হয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে লন্ডনস্ত মুসলিম সেন্টারে জাস্টিস ফর রোহিঙ্গা ইউকে’র আয়োজিত সভায় বক্তারা এ সব কথা বলেন। তারা আরো বলেন পৃথিবীর ইতিহাসে বেশ কিছু চরম গণহত্যার তালিকায় রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ অন্যতম হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করছে না।প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে তদানিন্তন বিএনপি সরকার মিয়ানমারের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সমস্যাটি একটি সহনীয় পর্যায় নিয়ে আসে। প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশের সীমান্তে আর্মি ক্যাম্প বসান। সরণাথীদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশে সরকারীভাবে বাধার সৃষ্টি করে।
কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে চলমান গণহত্যায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা আবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসে । বাংলাদেশ সীমান্তে শরণার্থীর ঢল দেখা যায় । সেই সংখ্যা পাঁচ/ছয় লক্ষর কম নয় । যাদের মধ্যে ছিন্নমূল ও বিধবা নারীর সংখ্যাই বেশি। সীমান্তে ওপারে জ্বলন্ত আরাকানে শত শত স্বজনের লাশ ফেলে এসেছে এই অসহায়-হতভাগা মানুষগুলো। যারা আধুনিককালের বর্বরতম গণহত্যার শিকার।

এ সময় বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার প্রথমে রোহিঙ্গা সরণার্থীদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে মানবিক কারণে তাদেরকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দেয়। যা বাংলাদেশের জন্য এখন গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং এর ভয়াবহতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রবিন মারস পরিচালক জাস্টিস ফর রোহিঙ্গা ইউকে,মার্ক ফারমানার পরিচালক বর্মা কমপেইন ইউকে, আফজাল খান এমপি,কেইত বেস্ট সাবেক এমপি, সাওকাত আলি সভাপতি ব্রিটিশ ফ্রেন্ড অফ লেবার পার্টি এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন ডক্টর ফরিদ পানজাওনী, ডক্টর আহমদ আল ডুবান, ডক্টর আব্দুল বারী, ব্যারিস্টার কাউন্সিলর নজির আহমেদ,ব্যারিস্টার মিশেল পলক, শেখ রামজি, সাংবাদিক কে এম আবু তাহের চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল কাদের সালেহ , টিভি সাংবাদিক সামসুল আলম লিটন প্রমুখ ।

মিয়ানমারের বর্তমান রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে সেমিনারের বক্তারা। যে তদন্ত কমিটি রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবে তুলে আনবে এবং ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীর পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবি তুন খানের পরিচালনায় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সেমিনারে কাউন্সিলর ব্যারিস্টার নজির আহমেদ বলেন ,জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা ভেস্তে যায়। পরে বাংলাদেশ মিয়ানমার সরকারের সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থী ফিরিয়ে নেয়ার জন্য একটা চুক্তি স্বাক্ষর করে । যে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে ভীষণ গোপনীয়তা রক্ষা করে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার। তিনি বলেন সৌভাগ্য ক্রমে চুক্তির একটি কপি আমার হাতে এসেছে। সেখানে পরিষ্কার ভাবে লেখা আছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক একথা প্রমান করতে পারলেই তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার সরকার। ব্যারিস্টার নজির বলেন, ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া সত্ত্বেও, বার্মার আইন এই সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে তাদের জাতীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে । এছাড়াও তাদের আন্দোলনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাখির মতো হত্যা করে ,ঘরবাড়ি আগুনদিয়ে জ্বালিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । নারী, শিশু, বৃদ্ধরাও রেহাই পায়নি এই বর্বর নৃশংস গণহত্যার কবল থেকে।
ইতিহাস থেকে এটাও জানা যায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন অনুসারে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ১৯৮২ সালের আইনে “রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অর্জনের সম্ভাবনা কার্যকরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। অথচ মানুষগুলো সুপ্রাচীনকাল থেকেই আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে।

তিনি প্রশ্ন করেন এমত অবস্থায় রোহিঙ্গা সরণার্থীতা কিভাবে প্রমান করবে যে তারা মিয়ানমার তথা বার্মিজ নাগরিক ?জাতিসংঘ, ব্রিটিশ সরকার ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দর প্রতক্ষ হস্তক্ষেপে নির্যাতিত রোহিঙ্গা সরণার্থীদেরকে নিজ দেশে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে নেয়া হোক অথবা তাদের জন্য আরাকানকে স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করার দাবি জানান ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ। অন্যথায় রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলে তিনি উৎবেগ প্রকাশ করেন।


রোহিঙ্গা শরণার্থী ,কাশ্মীর ও চীনের নির্যাতিত মুসলিম সহ গোটা দুনিয়ার নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য সেমিনারে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন প্রফেসর আব্দুল কাদের সালেহ। পরিশেষে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ফান্ড সংগ্রহ ও নৈশ ভোজের মাধ্যমে সেমিনারের সমাপ্তি হয়।

Leave a Reply

More News from কমিউনিটি

More News

Developed by: TechLoge

x