হিন্দুত্ববাদীদের তোপের মুখে নেটফ্লিক্স

Posted on by

মার্কিন মিডিয়া সার্ভিস প্রোভাইডার ‘নেটফ্লিক্স’ ভারতে হিন্দুবিরোধী কনটেন্ট প্রচার করছে, এই অভিযোগে তারা সে দেশে বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছে।


এই আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সার্ভিসটি ভারতে ইদানীং দারুণ জনপ্রিয়।
কিন্তু তাদের ‘সেক্রেড গেমস’ বা ‘লেয়লা’-র মতো বিভিন্ন সিরিজ আসলে হিন্দুদের ও ভারত রাষ্ট্রের জন্য ‘চরম অবমাননাকর’ বলে দাবি করেছে শিবসেনার মতো হিন্দুত্ববাদী দল।
ভারতের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপেও নেটফ্লিক্সকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে।
কিন্তু কেন নেটফ্লিক্সের মতো একটি বিনোদন প্ল্যাটফর্ম ভারতে এই ধরনের তোপের মুখে?
বস্তুত বছরদুয়েক আগে ভারতে তাদের সার্ভিস চালু করার পর থেকেই হু হু করে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছে নেটফ্লিক্স।
মাসে মাত্র দুশো রুপি বা তিন ডলারেরও কমে ভারতে যে কেউ এর গ্রাহক হতে পারেন – এত শস্তা দরে নেটফ্লিক্স সম্ভবত দুনিয়ার আর কোথাওই মেলে না।
কিন্তু ভারতের মতো বিশাল বাজারে নেটফ্লিক্সের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ এই প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে তীব্র হুমকির সম্মুখীন।
কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনার নেতা রমেশ শোলাঙ্কি নেটফ্লিক্সের বিরুদ্ধে মুম্বাই পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তিনি বলছিলেন, “নেটফ্লিক্স হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী দেখিয়ে অপমান করছে কিংবা ভারতের মানুষ বা সংস্কৃতিকে হেয় করে দেখাচ্ছে।”
“তাদের সিরিজ দেখলে মনে হয় ভারতীয় সেনারা আসলে জঙ্গী, খুন-ধর্ষণ করা তাদের কাছে জলভাত।”
“এটা আসলে হিন্দুদের কলঙ্কিত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র – পয়সা দিয়ে গ্রাহক হও আর নিজেদের অপমানিত হতে দ্যাখো!”
পপুলার সিরিজ সেক্রেড গেমসে যেভাবে ‘গুরুজি’ নামে এক হিন্দু ধর্মগুরুর চরিত্র তুল ধরা হয়েছে – কিংবা লেয়লা-তে যে কল্পিত হিন্দুরাষ্ট্রের ছবি আঁকা হয়েছে, নেটফ্লিক্স-বিরোধীদের মূল আপত্তি সেখানেই।
অপ-ইন্ডিয়া পোর্টালের সম্পাদক অজিত ভারতীর কথায়, “লায়লা-মজনুর গল্পকে চিরকাল লোকে প্রেমকাহিনি বলেই জেনে এসেছে, কিন্তু নেটফ্লিক্সের ‘লেয়লা’ হিন্দুদের প্রতি শুধু ঘৃণাই উসকে দেবে।”
“কল্পিত দেশ আর্যাবর্তের নামে যে গল্প তারা বলছে তা দেখলে মনে হবে ভারত যেন হিটলারের মতো স্বৈরতন্ত্রী শাসনে, গণতন্ত্র এখানে খতম!”
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কমেডিয়ান হাসান মিনহাজের ‘পেট্রিয়ট অ্যাক্ট’ শো-টিকেও আক্রমণের নিশানা করেছে এই শিবির, সেই সঙ্গে নেটফ্লিক্সের ‘ঘৌল’ নামে সিরিজটিকেও।
পলিটিক্যাল স্যাটায়ারিস্ট আকাশ ব্যানার্জির কথায়, “অ্যান্টি-ন্যাশনাল, আরবাb নকশাল, জেএনইউ গ্যাং ইত্যাদির পর দেশ এখন এক নতুন শত্রু পেয়েছে – আর সেটা হল বিদেশি কোম্পানি নেটফ্লিক্স।”
“এরাই যেন এখন দেশকে ভাগ করার চেষ্টা করছে।”
“সিনেমা হলে এগুলো দেখানো হলে এতক্ষণে আগুন জ্বলে যেত, কিন্তু নেটফ্লিক্স যেহেতু সরাসরি ঘরের ভেতরের টেলিভিশনে বা মোবাইল ফোনে ঢুকে পড়ে – তাই দেশ ও সংস্কৃতির রক্ষাকর্তারা খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না।”
কিন্তু নেটফ্লিক্স-বিতর্কে এই রসিকতা বা বিদ্রূপের বাইরেও একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ‘ডিজাইন’ দেখছেন অশোকা ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজের প্রধান, অধ্যাপক বৈজু নারাভানে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, “প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক মদতেই ভারতীয় সমাজ এখন যে কোনও ব্যাপারে অতি-সংবেদনশীল হয়ে উঠছে, অতি অল্পতেই তাদের ভাবাবেগ আহত হচ্ছে।”
“ওয়েন্ডি ডনিগারের অ্যাকাডেমিক গবেষণাকে হিন্দুবিরোধী বলে খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে, পদ্মাবতীর সেটে আগুন জ্বলছে, কমেডিয়ানরা পর্যন্ত ছাড় পাচ্ছেন না – আর নেটফ্লিক্স সেই তালিকাতেই সবশেষ সংযোজন।”
“অথচ সেন্সর বোর্ডের নজরদারি এড়িয়ে নেটফ্লিক্স ভারতে সমকামিতা থেকে জাতপাত, বিভিন্ন ট্যাবু বিষয় নিয়ে ছবি করার একটা চমৎকার প্ল্যাটফর্ম এনে দিয়েছিল – এটা নিষিদ্ধ হলে দেশের ফিল্মনির্মাতারা সে সুযোগ হারাবেন।”
নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়া অবশ্য এখনও এই বিতর্ক নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি, তবে তাদের বিতর্কিত সিরিজগুলোর প্রচারও বন্ধ হয়নি।
BBC

Leave a Reply

More News from আন্তর্জাতিক

More News

Developed by: TechLoge

x