শৈশবের ঈদ: পিছু ডাকা স্মৃতি ॥

Posted on by

টরোন্টো থেকে আঞ্জুমান রোজী : শৈশবের ঈদস্মৃতি নিয়ে লিখতে বসে স্মৃতির পাতা উলটিয়ে যাচ্ছি। অতীতকে হাতড়িয়ে কাছে টানার এক মিথ্যে প্রয়াস শুধু। সুখস্মৃতি তো খুব বেশি মনে দাগ কাটে না; যতটা দাগ কাটে দুঃখস্মৃতি। শৈশব মানেই যেন নিরবচ্ছিন্ন, নিশ্চিন্ত, নির্ঝাঞ্জাট এক নিষ্পাপ সময়। যেন সুখময় স্মৃতির ভাণ্ডার, যা অনেকের কাছে সুখের অন্তহীন উপাখ্যান বা আনন্দলোকের প্রাণশক্তি হয়ে আছে। জরাজীর্ণ সময়ের ক্ষয়িষ্ণু আবর্তে মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠে; তখন শৈশবের স্মৃতিচারণ করে সুখের আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেইসব দিনে। এমন সব সুখসুখ সময়কে কাছে টেনে আনতে খুবই বেগ পেতে হয় বৈকি। তারপরেও শৈশবের ঈদ অন্যরকম দ্যোতনা নিয়ে স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। শৈশবের ঈদ মানেই পার্থিব সুখ পাওয়া। শৈশবের ঈদ মানেই নির্মল আনন্দে অবগাহন করা।

আজ শৈশবের ঈদ নিয়ে ভাবতে বসে চোখের পাতায় ভেসে যাচ্ছে স্মৃতির নহর। সে-সময়ের ঈদস্মৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বটে। মহা ধূমধামের এই আনন্দযজ্ঞ এত সহজে ভোলার নয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবনের ঈদ হলো আড়ম্বরপপূর্ণ এক বিশাল আয়োজন। ঈদুল ফিতর-এর আয়োজন শুরু হয়ে যায় রমজান মাসের প্রথমদিন থেকেই। প্রস্তুতির নানাবর্ণের সাজ-সাজ রূপে শৈশবে যখন ঈদ এসেছে; তখনই এর বহুমাত্রিক আনন্দধারার কথা মনে করলে—সুখের খেরোখাতাটা আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে। জীবন্ত হয়ে ওঠে ঈদ-আনন্দের অনুভূতিগুলোও।

আর ঈদ মানেই তো ধনী-গরিব, উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ ভুলে নির্মল আনন্দে মেতে ওঠা। এমন আনন্দের ফল্গুধারাকে প্রাণে-টানে একাকার করে তোলে শিশুরা। তাই শিশুদের ঘিরেই যেন ঈদ আনন্দের যত আয়োজন।

আমাদের ঈদের আনন্দ ছিল অন্যরকম। আমার মা’কে দেখেছি—ঈদ এলেই বাড়িঘর সাজানোর কাজে লেগে যেতেন। সেই ছোট থেকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় আমরাও নতুন নতুন জামাকাপড় নেওয়ার চেয়ে বাড়িঘর নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করতাম। এই পরিকল্পনা রমজান মাসের শুরুতেই হয়ে যেতো। জানালায় নতুন পর্দা, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, সোফার কভার, কুসনের কভার এমনকী ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানোর ডেকোরেশনের কথাও ভাবতে হতো! এইসমস্ত কভারে থাকতো আমার মায়ের হাতের সুনিপুণ সূচিকর্ম। যা আমাদের আনন্দের এক ভিন্নমাত্রা! ঈদের রসনাবিলাসের দায়িত্ব পুরোটাই আমার মা’য়ের। আমরা শুধু ঘুরে ঘুরে রসুইঘরে গিয়ে উঁকি দিয়ে আসতাম। সেইসঙ্গে চলতো পুরো বাড়ি ধোয়ামোছা করার কাজ। আমাদের বাড়ির ভেতরে-বাইরে প্রচুর ফুলের গাছ ছিল। কিছু ইনডোর প্লান্টও ছিল। যা দিয়ে ঘর সাজাতাম। আমার ব্যক্তিগত পছন্দ—প্লান্ট দিয়ে ঘর সাজানো। এই কাজটা আমি আর আমার ছোটবোন খুব যত্ন করে করতাম। চাঁদরাতের আগের দিন আমার ছোটবোন বাহির বারান্দা থেকে শুরু করে বাড়ির হলওয়ে হয়ে পুরো উঠোনজুড়ে আলপনা করতো। আর চাঁদরাতে তো মেহেদী পরার হিড়িক পড়ে যেত। আমার ছোটবোন চমৎকার ডিজাইন করে মেহেদী পরাতো। প্রতিবেশী মেয়েরা সব আসতো আমাদের বাসায়।

ঈদে নতুন জামাকাপড়ের বিষয়টা যে একেবারে ছিল না, তা নয়। আমার মা নিজহাতে আমাদের জামা বানিয়ে দিতেন। তাতে অনেক ডিজাইন করা থাকতো। ঈদের জন্য নতুন জামা দেওয়া হতো ঠিকই; তা নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা ছিল না; একমাত্র আমার মেঝোবোন ছাড়া! তাকে আবার তার চাহিদা মতই জামা দিতে হতো। ঈদের নতুন জামা লুকিয়ে রাখার বিষয়টাও বুঝতাম না। কেউ দেখতে চাইলে দেখিয়ে দিতাম। আমার মা বলতেন, মেয়েটা বোকা। ঈদের জামা ঈদের আগে কেউ দেখায়? আমি বলতাম, কেন মা; কী হয়েছে তাতে? মা হেসে বলতেন, জামা পুরনো হয়ে যায়। আমি বলতাম, জামা পরাই হলো না। পুরনো হলো কেমন করে! ঈদের জামাকাপড়ের বিষয়টা আমাদের কাছে এমনই ছিল।

ঈদের দিন আমরা কোথাও যেতাম না। এমনকী এবাড়ি-ওবাড়িও যেতাম না। শুধু আমাদের বাড়িতে মেহমান আসার অপেক্ষা করতাম। তাদের আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। আমার মনে হতো, ঈদ মানেই বাড়িভর্তি মেহমানের আনাগোনা! একেবারে ঈদের নামাজের পর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। আমাদের বাসায় এমনই অবস্থা ছিল। আমার মায়ের সঙ্গে আমরাও মেহমানদারিতে ব্যস্ত থাকতাম। ঈদের বেড়ানো শুরু হতো ঈদের পরের দিন থেকে। এই বাড়ি সেই বাড়ি—ঈদের দাওয়াত নিয়ে।

আমার শৈশবের ঈদের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হলো আব্বার সঙ্গে ঈদগাহে যাওয়া। আব্বা বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ঈদের মাঠে যেতেন। নামাজে সেজদা যাওয়ার সময় আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম আর দেখতাম যেন বিশাল সমুদ্রে সারিবদ্ধ সাদা-সাদা ঢেউ-সাজানো রূপ। দারুণভাবে পুলকিত হতাম। নামাজ শেষে সবার কোলাকুলির দৃশ্য দেখতে দেখতে বাবার হাত ধরে বাসায় ফিরে আসতাম। একটু বড়সড় হওয়ার পর আর কখনো ঈদগাহে যাওয়া হয়নি। তবে ঈদগাহ থেকে ফিরে আসামাত্রই আমরা সবাই বাবাকে সালাম করে ঈদী নেওয়ার চেষ্টা করতাম। যত ময়মুরুব্বি আমাদের বাসায় আসতেন; সবাইকে সালাম করতাম ঠিকই; তবে ঈদী পাওয়ার আশায় নয়। মা বলতেন মুরুব্বিদের দোয়া নিতে হয়।

ঈদ অর্থ আনন্দ। এই আনন্দ সর্বজনীন। যদিও বিদেশবিভূঁই এসে সে আনন্দের ছিটেফোঁটাও জোটে না। তবে শৈশবের ঈদস্মৃতি আজও আমাকে গভীরভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়। খুবই মনে পড়ে সেসব দিনের কথা। বহুদূর ফেলে এসেছি শৈশবের সেই ঈদের দিনগুলো। পিছুডাকা স্মৃতির খাতায় সেই দিনগুলো আজ শুধুই দূর অতীতের মধুর হাতছানি। বারবার কুড়িয়ে পাওয়া স্মৃতিময় দিনের সুখের ছবি।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x