মেশিন যখন আপনার বস হয়ে আপনাকে চাকুরি থেকে ছাঁটাই করবে

Posted on by

এরকম একটি শিরোনাম হয়তো এরই মধ্যে আপনার চোখে পড়েছে কয়েকবার- ভবিষ্যতে রোবট এসে কেড়ে নেবে আপনার চাকরি।
কিন্তু কিছু ঘটনা এরই মধ্যে ঘটতে শুরু করেছে অনলাইনে সবচেয়ে বড় কোম্পানি আমাজনে। তবে আপনি যেভাবে আশংকা করেছিলেন সেভাবে নয়।


প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট ‘দ্য ভার্জ’ খবর দিচ্ছে, রোবট এখন আমাজনের কিছু ‘ফুলফিলমেন্ট সেন্টারে’ কর্মীদের ওপর নজরদারিই শুধু চালাচ্ছে না, কর্মীদের ছাঁটাই পর্যন্ত করছে। কোন কর্মীর উৎপাদনশীলতা কতটা, তার ওপর ভিত্তি করে রোবট নাকি এই কাজ করছে।
আমাজন যে যে ব্যবস্থা চালু করেছে, তাতে প্রতিটি কর্মীর উৎপাদনশীলতা মনিটর করে রোবট। তার উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে এরপর রোবট নিজেই সেই কর্মীকে সতর্ক করে দেয় বা কাজ থেকেই ছাঁটাই করে।
আমাজনে কর্মীরা যেরকম কম বেতনে কাজ করেন কিংবা সেখানে কাজের যে পরিবেশ, তা নিয়ে মাঝে মধ্যেই খবর বেরোয়। আমাজনের ওয়্যারহাউসে কাজ করেন এমন এক নারী কর্মীর অভিযোগ, যে পরিমাণ কাজের টার্গেট তাকে ঠিক করে দেয়া হয়েছে, সেটির জন্য তিনি ঠিকমত টয়লেটে পর্যন্ত যেতে পারেন না। কাজেই তিনি কাজের সময় পানি কম খান, যাতে তাকে টয়লেটে যেতে না হয়।
আমাজনের আরেকজন সাবেক কর্মী বলেছেন, তাদের সঙ্গে আমাজন এমন ব্যবহার করে, যেন তারাও রোবট। যে অবাস্তব টার্গেট দেয়া হয়, সেটি অর্জন করতে না পারলে সাথে সাথে কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেয়া হয়।
দ্য ভার্জের খবরে বলা হচ্ছে, আমাজনের হাজার হাজার কর্মীকে কেবল এই কারণে ছাঁটাই করা হচ্ছে যে তারা যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছেন না।
এই ঘটনা এমন এক দৃশ্যই তুলে ধরছে যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হবে আপনার বস। কোন মানুষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই এখানে রোবট নিজেই আমাদের কাজের ওপর খবরদারি করবে। আমাদের সতর্ক করে দেবে। কিংবা কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেবে।
দ্য ভার্জের খবর অনুযায়ী, আমাজনের এই সিস্টেমে কর্মীদের জন্য আপিল আবেদন করার একটা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
রোবট যখন আপনাকে রোবট বলে গণ্য করবে
“আমাজনে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গে রোবটের মতো ব্যবহার করছে রোবট”, বলছেন ইনস্টিটিউট ফর সেল্ফ রিলায়েন্সের স্ট্যাসি মিচেল।
“এখানে কর্মীদের গণ্য করা হচ্ছে বড় একটি যন্ত্রের চাকা হিসেবে, যাদেরকে চাইলে সহজেই বাদ দিয়ে দেয়া যায়।”
আমাজন তাদের কর্মীদের জন্য যে টার্গেট বা উৎপাদনশীলতার মান ঠিক করে দেয়, সেটি খুব সুস্পষ্ট নয়।
তবে এসব অভিযোগের জবাবে আমাজনের তরফ থেকে বিবিসি সহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে যে বিবৃতি পাঠানো হয়েছে, তাতে বলা হয়ঃ
“এটি একেবারেই সত্য নয় যে কর্মীদের একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ছাঁটাই করা হচ্ছে। অন্যান্য কোম্পানির মতোই আমাদের প্রতিষ্ঠানেও কর্মীদের কর্মদক্ষতার ব্যাপারে কিছু প্রত্যাশা থাকে, ফুলফিলমেন্ট সেন্টারে বা কর্পোরেট পর্যায়ে, যেখানেই তারা কাজ করুন না কেন।”
“আমরা কখনোই কোন কর্মীকে কর্মদক্ষতা উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট সাহায্য-সমর্থন এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বা সুযোগ না দিয়ে ছাঁটাই করি না। যেহেতু আমরা এমন একটি কোম্পানি যাদের ব্যবসা ক্রমশ বাড়ছে, কাজেই কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারে আরও ভালো করার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম ব্যবসায়িক লক্ষ্য।”
তবে আমাজনে অটোমেশন কতটা ব্যাপকভাবে হচ্ছে সে ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর আমাজন দেয়নি।
তবে এক সপ্তাহ আগে আমাজন প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা তাদের প্রাইম সার্ভিসের ডেলিভারি টাইম আরও কমিয়ে আনবে।
কিন্তু এর ফলে কি আমাজনের ওয়্যারহাউসে যারা কাজ করেন, তাদেরকেই মূল্য দিতে হবে?
কাজের ভবিষ্যত
কোন যন্ত্র মানুষের চাকুরি খাচ্ছে- এমন ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আর এটাকে তো শেষ বলাই যাবে না।
তাহলে ভবিষ্যতে চাকুরিজীবিদের কাজের ভবিষ্যৎ কী হবে?
কর্মীদের কাজের দক্ষতা রেকর্ড করার জন্য অনেক কোম্পানিই কিন্তু আগে থেকে যন্ত্রের ব্যবহার করছে।
ডিজিটাল অ্যানালিটিকস থেকে শুরু করে কোন ফ্যাক্টরিতে ‘ক্লক আউট’ করার বিধান এর অন্যতম উদাহারণ।
“এখন যেহেতু এরকম অনেক প্রযুক্তি চলে এসেছে, তাই এগুলো ব্যবহার করে কর্মক্ষেত্রে এরকম আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাবো,” বলছেন চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব পারসোনেল এন্ড ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর ডেভিড ডি সুজা।
“এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা এ ধরণের প্রযুক্তির ওপর কতটা নির্ভর করবো এবং এটি করতে গিয়ে কতদূর পর্যন্ত মানুষে-মানুষে সম্পর্ককে বাদ দেব।”
যখন কোন কোম্পানি তার কর্মীদের উৎপাদনশীলতা এভাবে যন্ত্র দিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যাচাই করতে যায়, তখন অনেক প্রশ্ন উঠে। এর মধ্যে আছে:
কর্মীদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কাজ আদায় করার ক্ষেত্রে একটা কতটা কার্যকর
এর কী প্রভাব পড়ে কর্মীদের ওপর এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তাদের মতামতের ওপর
এখানে কি কোন ধরণের মানবিক হস্তক্ষেপের দরকার আছে
এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ’র আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ক সিনিয়র এডিটর উইল নাইট কর্মক্ষেত্রে এ নিয়ে কী ধরণের অবস্থা তৈরি হতে পারে তার কয়েকটা উদাহারণ দিলেন।
“মানুষ আসলে নানাভাবে কাজ করে এবং একটি কাজ ‘ঠিকমত’ করার অনেক রকম উপায় আছে।”
“কাজেই কোন প্রতিষ্ঠান যখন তাদের কর্মীরা কী পরিমান ইমেল পাঠাচ্ছে তার ভিত্তিতে উৎপাদনশীলতা পরিমাপের জন্য এলগরিদম ঠিক করে, তখন একজন কর্মীকে হয়তো অনেক বেশি উৎপাদনশীল মনে হবে কারণ সে সবচেয়ে বেশি ইমেল পাঠাচ্ছে। কিন্ত অন্য আরেকজন কর্মীও হয়তো একই পরিমাণ কাজ করছেন এর চেয়ে কম ইমেল পাঠিয়ে।”
আর উৎপাদনশীলতা মাপার ব্যাপারটা যদি হয় আপেক্ষিক, যদি এর কোন নির্দিষ্ট মানদন্ড না থাকে, তখন কী হবে? আমাজনের এই বিতর্কতে তার কিছু আভাস আছে।
দ্য ভার্জের রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট যে আমাজন তাদের কর্মীদের উৎপাদনশীলতা মাপার জন্য যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেটি সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে:
“আমাজন দাবি করে থাকে যে কর্মীরা যেন মান বজায় রেখে কাজ করতে পারে সেজন্যে পুনপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তাদের প্রক্রিয়ারই অংশ। যখন কোন ওয়্যারহাউসের ৭৫ ভাগ কর্মী তাদের উৎপাদনশীলতার লক্ষ্য অর্জন করে তখনই কেবলা তারা তাদের উৎপাদনশীলতার মাত্রা বদলায়।”
স্ট্যাসি মিচেল খুব সহজভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন, “যখন একটি ওয়্যারহাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মী আমাজনের ঠিক করা উৎপাদনশীলতার লক্ষ্য অর্জন করে ফেলে, তখন তারা উৎপাদনশীলতার লক্ষ্য বাড়িয়ে দেয়। তখন কর্মীদের আবার নতুন লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে হয়।”
“যারা লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, তাদের ছাঁটাই এর ঝুঁকিতে পড়তে হয়। কাজেই এটা আসলে নিজের চাকুরি বাঁচানোর জন্য একটা উন্মাদ প্রতিযোগিতা, যেখানে সবাইকে চেষ্টা করতে হয় তারা যেন একদম নীচের দিকে না থাকে।”
এর কী প্রভাব পড়ে কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর
কর্মী নিয়োগ এবং ছাঁটাই এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অটোমেশনের মাধ্যমে চালানো উচিৎ কিনা তা ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন ডেভিড ডি সুজা।
“একটা কাজ বা প্রক্রিয়া অটোমেশনের মাধ্যমে করা গেলেই ধরে নেয়া ঠিক হবে না এভাবেই কাজটা করা উচিৎ বা মানুষ দিয়ে কাজটা এর চেয়ে ভালোভাবে করা যাবে না।”
“যে কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই চান তাদের যেন মর্যাদা দেয়া হয়, শ্রদ্ধা করা হয়। কিন্তু একটি কম্পিউটার কোড দিয়ে কোন কর্মীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের এরকম একটা সম্পর্ক তো করা সম্ভব নয়, অন্তত অদূর ভবিষ্যতে এমনটি হবে তা আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
২০১৮ সালে ইব্রাহিম ডিয়ালোকে তার চাকুরি থেকে ছাঁটাই করা হয়। তাকে ছাঁটাই করেছিল একটি মেশিন, তার ম্যানেজার নয়।
তার বস বেশ বিভ্রান্ত ছিলেন, কিন্তু কোন উপায় তার ছিল না। ইব্রাহিম ডিয়ালো বিবিসিকে বলেন, “আমাকে ছাঁটাই করা হলো। আমার ম্যানেজারের কিছুই করার উপায় ছিল না। আমাদের ডিরেক্টরেরও কিছু করার ছিল না। তারা ছিলেন ক্ষমতাহীন, অক্ষম। আমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এলাম।”
যেসব কোম্পানি অতিমাত্রায় অটোমেশনের ওপর নির্ভর করছে, তারা এই ঘটনা শুনে সতর্ক হবেন বলে আশা করেন ইব্রাাহিম ডিয়ালো। নইলে কর্মীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডেভিড ডি সুজা বলেন, “এমন যুক্তি দেয়া যেতে পারে যে কর্মীদের অভিজ্ঞতার বিচারে এধরণের প্রযুক্তি আসলে আমাদের কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে দিতে পারে।”
BBC

Leave a Reply

More News from প্রযুক্তি

More News

Developed by: TechLoge

x