বিলাতের রমজান সমাচার

Posted on by

সরওয়ার হোসেন

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন মুসলমানগণ। এরা পৃথিবীর নানান দেশ এবং সংস্কৃতি থেকে এসে যুক্তরাজ্যে থিতু হয়েছেন। পোশাক আশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং চালচলনে ভিন্নতা থাকলেও তারা সকলে এককাতারে নামাজ পড়েন এবং রোজা রাখেন। যুক্তরাজ্যের যেসব শহরে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে সেখানে তারা মসজিদ গড়ে তোলেছেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কমিউনিটি হলকে প্রথম পছন্দ হিসেবে নেওয়া হয়। এসব হল ভাড়ায় নিয়ে মুসলমানগণ নামাজ আদায় করেন। অনেক জায়গায় বাড়ি কিনে মসজিদ গড়ে তোলা হয়। অনেকক্ষেত্রে পুরাতন গীর্জা সেগুলো লোকজন না যাওয়ায় বন্ধ হয়ে পড়েছে সেগুলোকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে। আবার মসজিদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ভবন তৈরি করা হয়। সম্প্রতি ক্যামব্রিজ শহরে ২৩ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছে পরিবেশ বান্ধব মসজিদ। এছাড়া লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহামসহ বড় বড় শহরগুলোতে অনেক মসজিদ রয়েছে যেখানে একসাথে হাজার হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে।


যুক্তরাজ্যে রোজা পালনের বিষয়ে সাধারণত সৌদি আরবের নিয়ম মেনে চলা হয়। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে যুক্তরাজ্যে রোজা বা ঈদের চাঁদ অনেক দেরীতে দেখা যায়। অনেক সময় আকাশ মেঘলা থাকার কারণে চাঁদ দেখা সম্ভব হয়না। তাই এখানকার ইসলামী চিন্তাবিদগণ সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে রোজা পালনের সিদ্ধান্ত জানায়। বেশিরভাগ মুসলমান এ নিয়ম অনুসরণ করেন। তবে ভিন্নতাও রয়েছে। আমি যে এলাকায় থাকি সেটা পূর্ব লন্ডনের ফরেস্ট গেইট এলাকা। আমার বাসার কাছাকাছি তিনটি মসজিদ রয়েছে। এগুলো পাকিস্তানী অভিবাসী মুসলমান দ্বারা পরিচালিত। এবার সৌদি আরবে রোজা শুরু হয়েছে ৬ মে সোমবার থেকে। সে হিসেবে তারাবীর নামাজ পড়তে হয়েছে রবিবার রাতে। আমার বাসার আরো দুইজনসহ আমরা একটি মসজিদে গেলাম এশার নামাজের সময়ে। গিয়ে দেখলাম মসজিদে থেকে আমার প্রতিবেশি যিনি ভারতীয় অভিবাসী তিনি বের হলেন। তিনি জানালেন এই মসজিদে আজ তারাবী নামাজ হবেনা। তারা নাকি কাল থেকে তারাবী নামাজ শুরু করবে এবং রোজ রাখবে মঙ্গলবার থেকে। আমি ভাবলাম উপমহাদেশের হিসেবে তারা হয়ত রোজা রাখবে। এবার গেলাম অন্য মসজিদে। গিয়ে দেখলাম এশার নামাজ শুরু হচ্ছে। নামাজ শেষে ইমামসাহেব ঘোষণা দিলেন মরক্কো এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় রমজানের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় সোমবার থেকে রোজা শুরু হবেনা, রোজা শুরু হবে মঙ্গলবার থেকে। অগত্যা এশার নামাজ পড়ে বাসায় চলে আসলাম। এভাবে যুক্তরাজ্যে সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের নিয়মে রোজা পালন করা হয়।

তারাবীর নামাজের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ মসজিতে খতম তারাবী করা হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাফেজগণ এসে নামাজ পড়িয়ে থাকেন। সাধারণত রাত সাড়ে দশটায় শুরু হয় এশার নামাজ। তারাবী শেষ হতে হতে রাত বারটা- সাড়ে বারটা বেজে যায়। এরপর লোকজন বাসায় চলে যায়। তবে বাঙ্গালীপাড়া বলে খ্যাত পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল, গ্রিনস্ট্রিটসহ কিছু কিছু স্থানে খাবারের দোকানগুলো খোলা থাকে। এসব স্থানে সেহেরীর আয়োজন থাকে। লোকজন তারাবীর নামাজের পর এসব খাবারের দোকানে আড্ডা মারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন একসাথে সেহেরী পার্টি করে। শেষে সেহেরী খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে বাসায় যায়। সেহেরীতে সাধারণত ভুনা খিচুড়ী, মাংস ভুনা, তেহেরী বেশি থাকে।

সেন্ট পল ক্যাথড্রলে মাল্টিফেইথ ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নেন

রমজান মাসে বেশ আয়োজন করে ইফতারী সারেন মুসলমানগণ। ব্যতিক্রম নয় যুক্তরাজ্যও। এখানে রকমারী ইফতারী পাওয়া যায়। ছোলা, পিয়াজু, বেগুনী, পাকুরা যেমন থাকে, তেমনি তরমুজ, আঙ্গুল, আমসহ বিভিন্ন ফলমূলেরও আয়োজন থাকে ইফতারীতে। এছাড়া জিলাপী এবং নানা রকমের মিষ্টি থাকে। পাশাপাশি সিলেটের বিখ্যাত খিচুড়ী যেটা বেশ নরম করে বানানো হয় তা থাকে। বিরিয়ানীও খেয়ে থাকেন অনেকে। খাবারের দোকানগুলোতে ইফতারের সময় বেশ ভীড় থাকে। এখানে অনেক সংগঠন বেশ ঘটা করে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। কেউ কেউ রেস্টুরেন্টে এসব আয়োজন করেন। আবার কোন কোন সংগঠন হল ভাড়া করেও ইফতার মাহফিল করে থাকেন। শনিবার তেমনি একটি ইফতার মাহফিলে গেলাম। আয়োজক ছিল গ্রেটার চিটাগাং এসোসিয়েশন ইউকে। বেশ বড় পরিসরে ছিল আয়োজন, উপস্থিত ছিলেন প্রায় শতাধিক মানুষ। এখানে অন্য ধর্মের লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের সভাপতি ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন জানালেন, ইসলাম যে সম্প্রীতির ধর্ম তা অন্য ধর্মের লোকজনকে জানাতে ইফতার মাহফিলে তাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের অন্যতম গীর্জা সেন্ট পল ক্যাথড্রলে বরাবরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে মাল্টিফেইথ ইফতার। এতে অংশ নিয়েছিলেন লন্ডন মেয়র সাদিক খান, লন্ডনের বিশপ সারাহ মুলালিসহ মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

এবার বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির কারণে প্রায় সবগুলো মসজিদে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে আমি এক টকশোতে বলেছিলাম সরকারী সহায়তার দিকে চেয়ে না থেকে নিজস্ব তহবিল থেকে মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য ছিল প্রায় প্রতিটি মসজিদ চ্যারিটির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে তাদের ব্যয় নির্বাহ করে। মসজিদগুলোর নিরাপত্তার জন্যও একটা বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে টকশোর সঞ্চালক কথার প্রসঙ্গ দ্রুত পাল্টে ফেলেন। কিন্তু এরপর বাঙ্গালী অধ্যূষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র জন বিগসও মসজিদগুলোতে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহনের তাগিদ নেন। রমজান মাসে আমি অনেক মসজিদের দেখেছি নিজস্ব লোকজন দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকজন আবার অনেকে ক্ষেত্রে বেসরকারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে।
শেষ করছি রমজানের সময় এথনিক কমিউনিটির টেলিভিশনে চলমান চ্যারিটি সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলে। আমার স্বল্পদৈর্ঘ্য বিলাত জীবনে উল্লেখ্যযোগ্য অভিজ্ঞতা হলো টেলিভিশনে চ্যারিটিশো দেখা। বাংলা টিভিতে কাজ করার পূর্বে আমি নিজে একটি চ্যারিটি হয়ে দুএকটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। বাংলা টিভিতে বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করার পর থেকে কাছ থেকে চ্যারিটি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছে। বিকাল থেকে শুরু করে সেহেরী পর্যন্ত হুজুরগণ প্রাণান্ত চেষ্টা করে যত বেশি সম্ভব অর্থ সংগ্রহের জন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মসজিদ এবং এতিমদের জন্য মাদ্রাসা বানানোর প্রকল্প নিয়ে হাজির হয় বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব মসজিদ, মাদ্রাসার অবস্থান। আবার বিলাতের অনেকে মসজিদের জন্য অর্থ উত্তোলন করা হয়। এমনও হয়েছে একরাতেই সাড়ে তিনশ থেকে চারশ হাজার পাউন্ড উত্তোলন করা হয়। তবে এসব চ্যারিটির অর্থ আদৌ সঠিকভাবে ব্যয় হয় কিনা তা নিয়ে বাঙ্গালী কমিউনিটিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক সমালোচনা চলে আসছিল। অতিসম্প্রতি চ্যারিটি কমিশনের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে উত্তোলিত এসব অর্থের বেশিরভাগ ব্যয় হয় বেতনভাতায়। ফলে যে উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগন সরল বিশ্বাসে অর্থ দান করেন সে উদ্দেশ্য সফল হয় কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x