এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেপালও আছে, বাংলাদেশ নেই

Posted on by


লন্ডন-ভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ তাদের পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী এশিয়ার ৪১৭টি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি- এই চারটি মৌলিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত জরিপে নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। নাম আছে শ্রীলঙ্কার ‘ইউনিভার্সিটি অব কলম্বো’র।

এশিয়ার সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চীনের ‘সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়’। গত বছর এক নম্বরে থাকা ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’ এবার আছে দুই নম্বর অবস্থানে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ‘হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’। চীনের ৭২টি, ভারতের ৪৯টি, তাইওয়ানের ৩২টি, পাকিস্তানের ৯টি, হংকংয়ের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে তালিকায়।

নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় স্থান পেলেও, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কেনো স্থান পেলো না? বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের কাছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের মত, “তারা (টাইমস হায়ার এডুকেশন) সেসব সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকাটি দিয়েছে তাতে তারা সেগুলো এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পায়নি। কিন্তু, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা ওভারঅল যে মানের, তা বিশ্বমানের চেয়ে খুব বেশি যে পেছনে তা নয়। আমাদের ছেলেমেয়েরাই অন্যান্য নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাচ্ছে। সেখানে তারা প্রতিযোগিতা করে ভর্তি হচ্ছে। সেখান থেকে ব্রিলিয়েন্ট রেজাল্ট করে বের হয়ে আসছে। এমন চিত্র প্রতিবছরই আমরা দেখতে পাই। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের মান যদি র‌্যাঙ্কিংয়ের ক্যাটাগরিতে নিয়ে আসি তাহলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাবো বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু, অবকাঠামোর দিক থেকে- বাজেট বরাদ্দ, ল্যাবরেটরি-লাইব্রেরি সুবিধা- এগুলোর দিক থেকে আমরা বিশ্বমানের চেয়ে পিছিয়ে আছি- সেটি অস্বীকার করা যাবে না। এই সীমিত সুযোগ দিয়ে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের যে পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি সেটি একটি র‌্যাঙ্কিংয়ের দাবি রাখে।”

সর্বত্র আলোচনার বিষয় দেশে শিক্ষার মান কমছে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে না।- “গবেষণার মাত্রা আগের থেকে বেড়েছে। আগের থেকে তহবিলও বেড়েছে। কিন্তু, যে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় যাওয়ার কথা ছিলো সেটি হয়তো এখন পর্যন্ত যায়নি। সেই চেষ্টাই চালিয়ে যেতে হবে। রাতারাতি তো কোনো কিছু পরিবর্তন করা যায় না। মোটামুটিভাবে এখন আগের থেকে ভালো অবস্থায় আমরা যেতে চেষ্টা করবো। তহবিলের একটা সঙ্কট থেকে যায়। সমসাময়িককালে তা অনেক বাড়ানো হয়েছে। এখন মান বাড়ানোর জন্যে গুরুত্ব বেশি দেওয়া দরকার। এখন আমাদের ফ্যাসিলিটি আর শিক্ষকদের মান বাড়ানোর জন্যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নয়। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাড়াতে হবে। শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষায় এসে মান বাড়ালে চলবে না। প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায়ে মান বাড়ানো না গেলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং হঠাৎ করে বাড়াতে পারবো না।”

আপনি বলছেন যে গ্র্যাজুয়েটদের মান ভালো… “ভালো বলতে আমি বলছি না সবাই একই মানে চলে গেছে। আমাদের বহু ছেলেমেয়ে হার্ভার্ড, প্রিন্সটনে প্রতিযোগিতা করে ভর্তি হয়ে ভালো ফল নিয়ে বের হয়ে আসছে। এখন মানের ক্ষেত্রে যে সমস্যাটির মুখোমুখি আমরা হচ্ছি তার একটি বড় কারণ যে আমাদের শিক্ষার ওভারঅল যে মান- প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত- সব জায়গায় মানের যে অবনতি ঘটেছে বা মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি তার কারণ হচ্ছে যে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সর্বত্রই আমাদের শিক্ষা এবং শিক্ষকদের মান বাড়ানোর প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রাথমিক শিক্ষায়।”

তা এতোদিন করা হয়নি কেনো বলে আপনি মনে করেন?- “এখানে অনেক কারণই হয়তো রয়েছে। তবে একটি বড় কারণ হচ্ছে অর্থের স্বল্পতা। প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো বেতন-ভাতা দিয়ে যে শিক্ষক নেওয়া দরকার সেটি হয়তো দেওয়া যাচ্ছে না। সে জন্যে যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে চাচ্ছে না। কেউ হয়তো অন্য কোথাও চাকরি না পেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। সে কারণেই আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন করা যাচ্ছে না।”

“শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড কিন্তু শিক্ষার মেরুদণ্ড হচ্ছে শিক্ষকরা। সেই শিক্ষকতা পেশায় মেধাবী ছেলেমেয়েদের আকর্ষণ করানো জন্যে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া দরকার তা তো দেওয়া যাচ্ছে না বা দেওয়া হচ্ছে না।”

নেপালেরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?- “নেপালের বিশ্ববিদ্যালয় যদি থাকে আর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেনো নেই তা আমাদের প্রশাসনে যারা রয়েছেন তারা বলতে পারবেন। বিশেষ করে, কোন সূচকে আমরা পিছিয়ে রয়েছি তা দেখতে হবে। আর আমি বলছি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কথা।”

একইভাবে জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সমালোচনা করা হলেও সেই দেশের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় স্থান পেয়েছে।– “জঙ্গিরাষ্ট্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়তো আলাদা জিনিস। সেখানকার জঙ্গিবাদ তো অস্বীকার করা যাবে না। হয়তো তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো করছে।”

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি কোনো ‘আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি’ আছে? “আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করতে হবে। আমরাতো সেই চেষ্টাই করছি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাহলে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়বে কীভাবে?- “আমি উপাচার্য থাকাকালে কমনওয়েলথ বৃত্তির মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে গিয়েছি। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়াশুনা করে। এগুলো ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তা বাড়লে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়বে।”

সেই সহযোগিতার কাজ করে কারা?- “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।”

যেহেতু বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে সেহেতু বলা যায় কি- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সে কাজে পিছিয়ে যাচ্ছে?- “আমি যতদূর জানি- বেশকিছু সহযোগিতামূলক কাজ আগে নেওয়া হয়েছিলো এখন সেগুলো চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে কী না এবং সেগুলোকে আরও বাড়ানো হয়েছে কী না- সেটি আমি ঠিক বলতে পারবো না। কিন্তু, পারস্পরিক সহযোগিতা লাগবে। তাছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করবে কীভাবে?”

আপনি যখন উপাচার্য ছিলেন তখন কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতেন?- “মূলত আর্থিক সমস্যা। আন্তর্জাতিকমানের সুবিধাগুলো দেওয়া জন্যে যে তহবিল দরকার সেটির দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম।… আস্তর্জাতিকমানের সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক মান দিতে হবে। সেটির দিক থেকে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।”
তাহলে সরকার যে উন্নয়নের কথা বলছে তা শিক্ষাখাতে পড়ছে না?- “পড়ছে। কিন্তু, উন্নয়ন কি আমেরিকার বা জাপানের মানের হয়েছে? আমরা বলবো- না, সেই তুলনায় হয়নি। আমরা ২০০৯ সালে যে জায়গায় ছিলাম ২০১৯ সালে অনেকদূর এগিয়ে এসেছি- এতে কোনো সন্দেহ নেই।”

দেশ শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়েছি কি?- “হ্যাঁ, শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে।”

তাহলে কি শুধু সংখ্যায় বেড়েছে? মানের দিক থেকে বাড়েনি?-“মানের দিক থেকেও বেড়েছে। না বাড়ার তো কোনো কারণ নেই।”

মানের দিক থেকে বাড়লে তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকতো এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়? সেখানে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে।– “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তো আগে ছিলো। এখন কেনো নেই এখন যারা প্রশাসনে রয়েছে তারা বলতে পারবে।’’

টাইমস হায়ার এডুকেশন তাদের জরিপের কাজে যে চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সেগুলো হলো- পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি- এসবের মধ্যে কোনটিতে আমরা এগিয়ে আছি বলে আপনি মনে করেন?- “আমার মনে হয় এই চারটিতেই আমরা এগিয়ে আছি। কমবেশি হয়তো হবে। পাঠদানে বেশ ভালো অবস্থায় থাকার কথা আমাদের। গবেষণার বিষয়ে আমাদের তহবিলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও গবেষণার কাজ চলছে। পাঠদান যেহেতু হচ্ছে তাই জ্ঞানের আদান-প্রদান হচ্ছে। আর থাকলো আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি- আমাদের ফ্যাকাল্টির সদস্যরা ফুলব্রাইট স্কলারশিপসহ বিভিন্ন বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে লেখাপড়া করছেন। তারা যখন দেশে ফিরে আসেন তখন একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ভেতর নিশ্চয় তৈরি হয়।”

সবদিক থেকেই যদি উন্নয়ন হয়ে থাকে তাহলে কেনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে স্থান পাচ্ছে না?- “প্রতিযোগিতা তো হচ্ছে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিগুলোর সঙ্গে। তাই র‌্যাঙ্কিংয়ে হয়তো আসতে পারছে না।”

তাহলে বিশ্বমানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দেশে তৈরি হয়নি। বিষয়টি কি এরকম?- “না, তা নয়। সবই বিশ্বমানের। কিন্তু, এশিয়ায় যে ৪১৭টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে আমরা তার মধ্যে যেতে পারিনি।”

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আমাদের দেশ পিছিয়ে গেছে বলা যাবে কি?- “এই র‌্যাঙ্কিংটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে হয়তো আমরা পিছিয়ে রয়েছি। তবে ঠিক রিভার্স র‌্যাঙ্কিংয়ে গেলে আমরা এগিয়ে যাবো।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “এশিয়ার মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে। এক নম্বর কারণ হচ্ছে, উচ্চশিক্ষায় আমাদের বাজেট দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে কম। আর শিক্ষা বাজেট যে ২.১ শতাংশ রয়েছে সেটিও দক্ষিণ এশিয়ার মান থেকে অনেক পিছিয়ে। আমরা যদি গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি না করি, সেখানে শুধু ক্লাসের পাঠদানই র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে না। এটি অনেককিছুর সমষ্টি। পাঠদানের মানের পাশাপাশি শিক্ষকদের যোগ্যতাও দেখতে হয়। শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রকাশনাও থাকতে হয়। পিএইচডি কোথা থেকে করা হলো, থিসিসের বিষয়টা কী- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তারপর পাঠদানের মানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। র‌্যাঙ্কিংয়ের সময় সেগুলোও বিবেচনায় আসে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে সেখানে গবেষণা খাতে কতো টাকা থাকে সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ-সুবিধা কেমন রয়েছে? অর্থাৎ, গ্রন্থাগারে কী কী বই রয়েছে। আমরা প্রতি বছর কী কী বই কিনছি তারও একটি তালিকা অনলাইনে চলে যায়। দেখা যায় যে আমরা পাঁচ-ছয় বছর পর পর বই কিনি। খুব কম বিভাগ রয়েছে যারা তাদের বইয়ের তালিকা হালনাগাদ করতে পারে। কারণ, টাকা বরাদ্দ অনেক কম থাকে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কথা বলতে পারি- বই একবার কিনলে দুই/তিন বছরের মধ্যে আবার বই কেনার টাকা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর যদি ২০টি বইয়ের তালিকা দেই তাহলে পাঁচটি বই পাই। আমাদের গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা কেমন রয়েছে? প্রত্যেক বিভাগের কি পর্যাপ্ত গ্রন্থাগার রয়েছে? আমাদের শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে যায় কিন্তু, তারা সেখানে যায় বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া জন্যে।– যারা র‌্যাঙ্কিংয়ের কাজ করেন এসব তথ্য তাদের কাছে থাকে।”

“এরপর, আমাদের শিক্ষকদের যে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সেখানে রাজনীতি থাকে তাহলে র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। নতুন শিক্ষক যে নেওয়া হচ্ছে তার মান কী? আমরা পিএইচডি ছাড়াই অনেককে অধ্যাপক করে ফেলি- সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর। পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কম হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। প্রভাষকের সংখ্যা কম। অধ্যাপকদের যোগ্যতা যাচাই করলে দেখা যাবে যে তিনভাগের একভাগ অধ্যাপকের কোনো পিএইচডি নেই। পিএইচডি গবেষণা কেমন হচ্ছে সেটিও দেখতে হবে। বিজ্ঞান অনুষদের গবেষণাগার হালনাগাদ করা হয়েছে- তাতো না। চার-পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যগুলোর কোনো স্যান্ডার্ড নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই। সেটিও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কো-কারিকুলাম অ্যক্টিভিটিস কীভাবে হয়, শিক্ষার্থীদের যেসব কাউন্সিল থাকে সেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে কী না, যেমন অক্সফোর্ড ডিবেট ইউনিয়ন রয়েছে এবং সেটির মতো স্ট্রং বডি মনে হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টও না। আমাদের সেগুলো রয়েছে কী না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শেখাচ্ছে কী না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কী রকম। ক্লাস আওয়ার কতোটুকু।– এরকম অনেককিছু রয়েছে যা বিবেচনায় আনতে হয়।”

“এই যে ডাকসু নির্বাচন হলো- এরও প্রভাব পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মূল্যায়ন করতে গিয়ে। এখানে গণতন্ত্রের কোনো চর্চা হয় না, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শেখাচ্ছে কী? এর উদ্দেশ্য কী? আমরা যে শুধু চাকরিজীবী তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় করছি সেটি কিন্তু আমাদের পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মস্তবড় ফ্যাক্টর। আমরা গ্র্যাজুয়েটদের তৈরি করছি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্যে, সমাজকে আলোকিত করার জন্যে নয়। বিজ্ঞান অনুষদের অনেক শিক্ষার্থী বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে পাগল হয়ে থাকে। তারা তো বিসিএস দেওয়ার জন্য নয়। তারা গবেষক হবে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল থেকে পাশ করে বিসিএস দিয়ে অন্য কাজে যাচ্ছে।”

“আমাদের বড় বড় অফিসারদের ভাষা-জ্ঞান দুর্বল। তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষমতা মানসম্পন্ন নয়। র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণকারীরা এগুলোর খবরও রাখে। তারা তো অনেক রকমের জরিপ চালায়। যারা গ্র্যাজুয়েট তাদেরও সাক্ষাৎকার নেয়।”

আপনি এতো এতো সমস্যার কথা বললেন কিন্তু, এগুলো সমাধানের জন্যে কী করা হচ্ছে?- “আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতি না হলে মাধ্যমিকের উন্নতি হবে না। এইট-নাইনের ইংরেজি-জ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে। তাদের মানসিক বিকাশও সেরকম থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তারা হৈহৈ-চিৎকার করছে, দৌড়াদৌড়ি করছে যা সিক্স-সেভেনে, এইট-নাইনের ছেলেমেয়েরা করে থাকে। এরকম দৃশ্য নেপালের বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখা যায় না। সেই জন্যে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত করতে হবে। আমাদের ২০১০ সালে শিক্ষানীতিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনটি ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে যতোটা সম্ভব একটি ধারায় নিয়ে আসতে হবে। মাদরাসা থাকবে কিন্তু তাদেরকে বিজ্ঞান, কম্পিউটার শেখাতে হবে। এটি সম্ভব হলে আমাদের ফিডার সিস্টেমটা অনেক শক্ত হয়ে যাবে।”

“তারপর আসতে হবে কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায়। এটিকে বিলুপ্ত করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় রাখতে হবে। সেখানে কারিগরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিলেক্টেড এডুকেশন দেওয়া হবে। সবার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এটি শুনলে হয়তো খারাপ লাগে। কিন্তু, পৃথিবীর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই।”

“এছাড়াও, শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে বিমুখ হতে হবে। কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে বলতে হবে যে রাজনীতি করলে চাকরি থাকবে না। রাজনীতি করলে করবেন আদর্শের রাজনীতি। মানুষের জন্যে আমরা সংগ্রাম করবো, আমি শক্তভাষায় লিখবো, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেউ কাড়বে না। কিন্তু, আমি দলীয় রাজনীতি করলে দল থেকে দায়িত্ব নিতে হবে- আপনি তাকে ওয়ার্ড কমিশনার বানান, কাউন্সিলর বানান, কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখবেন না। এই বিরাজনীতিকরণকে আমাদের খুব গুরুত্ব দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি থাকবে না। বরং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রটি আরও বড় করে প্রস্তুত করতে হবে।”

“এরপর যা করতে হবে তা হলো- বাজেট বাড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন আমাদের শিক্ষাবাজেট জিডিপির ৪ শতাংশ হতে হবে। আমরা এখনো তা করতে পারিনি। আমাদেরকে তো জিডিপির ৪ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবেই। ক্রমান্বয়ে তা ৮ শতাংশে আনতে হবে। এসব সরকার বোঝে কিন্তু, সরকারকে এতো মানুষকে খুশি করতে হয়- আর এটি কেউ দাবিও করে না। আমাদের সরকার-অনুগত উপাচার্যরা, শিক্ষক বা শিক্ষক সমিতি জীবনেও এমন দাবি করবে না। সরকার মাঝে-মধ্যে আনন্দের সঙ্গে বড়-বড় কথা বলে কিন্তু, বাজেটে কোনো পয়সা দেয় না। বাজেট যদি না বাড়ানো যায় তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাটি নষ্ট হয়ে যাবে।”

“এছাড়াও রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, তাদের প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা, অ্যাক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি, ক্লাব সিস্টেম, মেনটর সিস্টেম তৈরি করা। পৃথিবীর সব দেশে এগুলো প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নোটবই, গাইডবই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। এগুলো করতে একটি মহাযুদ্ধের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বিভিন্ন পদে মেধার সঙ্কট দেখা দিবে। শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করতে পারলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ায় মানসম্পন্ন ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চলে আসবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, “তোমাকে একটা কথা বলি- আমাদের সকল ড্যাটা বা তথ্যাদি আমরা হয় সংগ্রহ করতে পারিনি বা আমরা দিতে পারিনি। যারা জরিপ করেন তারা বিভিন্নভাবে সেসব তথ্যাদি মূল্যায়ন করেন। তারা তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সেই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। কিন্তু, আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসোর্স, গবেষণা অনেক ওপরে। এগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়িত হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনেক উপরে।”

তথ্যাদি সংগ্রহ করতে বা দিতে পারেননি কেনো?- “যারা র‌্যাঙ্কিং করে তারাই নিবে। আমাদের কাছে চাইলে আমরা দিবো। আমাদেরকে সেগুলো তুলে ধরতে হবে এবং যারা জরিপ করবে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে (সেগুলো সংগ্রহ করার)।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সেগুলো তুলে ধরার কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?- “আমাদের পক্ষ থেকে তুলে ধরতে হবে আর যারা জরিপ করবে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

এতোদিনেও সেগুলো কেনো তুলে ধরা হয়নি?- “আমাদের ওয়েবসাইট রয়েছে। সেখানে তথ্যগুলো আপলোড করতে হবে। আমরা এখন সেই কাজ করছি। শিক্ষাকে রাজনীতি ও বাণিজ্যিককরণের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে।”

এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কী দাঁড়ালো?- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ভালো হবে। আমাদের অনেক রিসোর্স। অনেক ঐতিহ্য। জাতির উন্নয়নে এর অনেক অবদান রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিংয়ে শুধুমাত্র বাজেট এবং ছাত্রসংখ্যার অনুপাত দিয়ে করলেই হবে না। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতোটুকু অবদান রাখে র‌্যাঙ্কিং করার সময় সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। সেসব মানদণ্ডে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনন্য।”

আপনি বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনন্য কিন্তু, র‌্যাঙ্কিংয়ে এর কোনো অবস্থান দেখা যাচ্ছে না।– “কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১ লাখ ডলার দিয়ে একজন নোবেলবিজয়ীকে সমাবর্তনে আনবে না। আমরা আমাদের মূল্যবোধ অনুযায়ী চলি। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেককিছু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেসবে অংশগ্রহণ করে না।”

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল তথ্য-উপাত্ত যথার্থভাবে সংগৃহীত হলে এবং জাতীয় সকল উন্নয়নে এর অংশগ্রহণ সবকিছু মূল্যায়িত হলে এর মান অনন্যসাধারণ হবে।”

নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই র‌্যাঙ্কিংয়ে- “নেপাল থেকে আমাদের এখানে পড়তে আসে।”

নেপাল কী শিক্ষায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় স্থান পেয়েছে- “সেটি সেই বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারবে। আমার কথা হলো আমাদের প্রচুর তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সেগুলোর আপলোডিং লাগবে। যারা মূল্যায়ন করবে তাদেরকে সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যবোধ অন্য ধরনের।”

তাহলে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?- “না এ কথা বলা যাবে না। এগুলো হচ্ছে হঠকারী কথা। এসব উস্কানিমূলক কথার কোনো গুরুত্ব নাই। হঠকারী, উস্কানি, দোষারোপ- এগুলো দেওয়া যাবে না। আমাদের কর্তৃপক্ষকে এখন সেগুলো (তথ্য-উপাত্ত) যথার্থভাবে সরবরাহ করতে হবে। সেগুলো আপলোড করতে হবে। সেই উদ্যোগ আমাদের আছে।”

জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে যে পাকিস্তানের সমালোচনা হচ্ছে সেই দেশেরও নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে- “ফোনে এতোক্ষণ কথা বলো না। পরে এসব বিষয় নিয়ে কথা হবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকাটা খুবই দুঃখজনক। আমাদের দেখতে হবে কেনো এশিয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এলো না। আমাদের তা নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সেই মান অর্জনে কোথায় সমস্যা রয়েছে এবং সেগুলো সমাধানের পথ কী হতে পারে- শিক্ষা, গবেষণা বা কোন কোন ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে তা দেখতে হবে।”

“আমার মনে হয়, শিক্ষামন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে আমাদেরও নিজস্ব একটি মূল্যায়ন থাকা উচিত। আমরা কীভাবে (মানোন্নয়নের) সেই ক্যাটাগরিগুলোকে অ্যাড্রেস করবো। আমাদের কী কী করতে হবে। কোন ধরনের গবেষণায় আমরা এগিয়ে যাবো। সেই বিষয়গুলো যদি আমাদের জানা থাকতো তাহলে আমরা সেগুলো অ্যাড্রেস করতে পারতাম।”

আপনার দৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়?- “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে যে শিক্ষকরা নিয়োগ পাচ্ছেন বিশেষ করে যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাচ্ছেন না তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন পড়াচ্ছেন। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোযোগ দিতে পারছেন না। পাবলিক-প্রাইভেটের দোটানায় পড়ে অনেক শিক্ষক যথাযথভাবে পড়াতে পারছেন কী না- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিকমানের পাঠদান হচ্ছে কি?- “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যোগ্য শিক্ষক পাচ্ছে কী না- তা দেখতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে কিন্তু, বিভাগগুলো পর্যাপ্ত শিক্ষক পাচ্ছে কী না- তাও দেখতে হবে। যদি যোগ্য শিক্ষক না থাকে তাহলে বিভাগ খোলা উচিত না। সে ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টিকে মনিটরিংয়ের মধ্যে এনে একটি মূল্যায়নের প্রয়োজন। তাহলে হয়তো আমরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো।”

এই অবস্থা তো দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই যথাযথ মান অর্জন করতে পারছে না।– “তুমি যেটি বলছো সে প্রেক্ষিতে বলছি- আমরা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের এনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রিভিউ করে দেখেছি- আমাদের লাইব্রেরির ঘাটতি রয়েছে, গবেষণায় ঘাটতি রয়েছে, যোগ্য শিক্ষকদের ঘাটতি রয়েছে। কে কতোটুকু মেধাবী তার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। সবাই ভিসি হওয়ার জন্যে দৌড়চ্ছি। সবাই নির্বাচনের মাধ্যমে ডিন হওয়ার চেষ্টা করছি। যতো অপদার্থ, নিকৃষ্টমানের শিক্ষক হোক না কেনো নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি যদি ডিন হোন, ডিন হচ্ছে সর্বোচ্চ একাডেমিক পজিশন, তাহলে…। আসলে সব জায়গাতেই ভালো-মেধাবী শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে ঘাটতি রয়ে গেছে।”

“যেসব শিক্ষকদের কোনো আন্তর্জাতিক এক্সপোজার নেই তারা কী করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিশনারি চিন্তা দিতে পারবে। যার ভিশনারি চিন্তা-ভাবনা নেই, কোনো মিশন-অ্যাক্টিভিটি নেই, যার দেশের বাইরে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই তিনি কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দিবেন? যিনি নেতা হবেন তার সেসব গুণ থাকতে হবে। আমরা ঢালাওভাবে লবিং করে বা অন্যান্য পন্থায়, ছলচাতুরী করে, ভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে নিচ্ছি।”

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?- “সরকারের একটি বিশেষ কমিটি থাকা দরকার। যারা দেশের সত্যিকারের মেধাবী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি, তারা বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখবেন কারা প্রকৃত মেধাবী ব্যক্তি। তাদের বাছাইকৃত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একজন শিক্ষক ডিন, উপাচার্য হবেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা ও জ্ঞানের আদান-প্রদান কতোটুকু রয়েছে?- “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেনো গুণগতমান সম্পন্ন গবেষণা হয় সেগুলো মূল্যায়নের জন্যে একটি ভালো কমিটি থাকতে হবে। আন্তর্জাতিকমানসম্পন্ন শিক্ষকদের এনে আন্তর্জাতিকমানের কনফারেন্স, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাঠাতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের বাইরে থেকে শিক্ষার্থী আনতে পারছে না কারণ নিরাপত্তা নেই।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হয় সেগুলো তাহলে বাস্তবসম্মত?- “হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি তোমার সঙ্গে সহমত পোষণ করি। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের বা কলেজের শিক্ষক কেমন হবে তা একটি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে, কেন্দ্রীয়ভাবে ভালো শিক্ষকদের মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে নেওয়া যেতে পারে। যারা শিক্ষক রয়েছেন তারা কতোটুকু মানসম্পন্ন সেটিও যাচাই করা যেতে পারে।”

“দেখা যায় একজন শিক্ষার্থীর এসএসসি, এইচএসসির ফল ভালো না কিন্তু, সে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভালো ফল করছে। তখন অনেক সময় বুঝতে হবে, কোনো না কোনো শিক্ষক তাকে গ্রুমিং করছেন। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে সেই শিক্ষার্থী উঠে আসছে। কোনো কারণে হয়তো তাকে শিক্ষক করার জন্যে কোনো পরিকল্পনার মাধ্যমে দল ভারি করার জন্যে, নিজস্ব বাহিনী তৈরি করার জন্যে এমনটি করা হতে পারে।”

কিন্তু, আপনার এই কথাগুলো শিক্ষকরাই কতোটুকু গ্রহণ করেন?- “সেটাই তো প্রশ্ন, বাবা!… সরকারের পক্ষ থেকে একটা দায়িত্ব নেওয়া যেতে পারে। দায়িত্বটা অবশ্য কঠিন হবে। কিন্তু, কঠোর হতে হবে।… আমার যদি মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে হয় তাহলে মানসম্মত শিক্ষক লাগবে। আমরা ভর্তির মাধ্যমে ভালো শিক্ষার্থীদের বেছে নিচ্ছি। তাই সেখানে মানসম্মত শিক্ষক থাকতে হবে। আমাদের সিলেবাস-কারিকুলামগুলো সময়োপযোগী করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তা করাতে হলে সে জন্যে বাজেট থাকতে হবে।”

এর জন্যে সরকারের কাছে কি বাজেট চাওয়া হয়?- “চাওয়া তো হয়। কিন্তু, বাজেট অত্যন্ত অপ্রতুল। তবুও আমি মনে করি, আগের তুলনায় আমরা অনেক বেশি এগিয়েছি।”

শিক্ষায় আমরা কতোটুকু এগিয়েছি?- “আমি তো মনে করি আগের তুলনায় আমরা অনেকটুকু এগিয়েছি। কিন্তু, সংখ্যার দিক দিয়ে শুধু বিচার করলে তো হবে না। শিক্ষার মানের দিক দিয়েও বিচার করতে হবে।”

আমরা গুণগত শিক্ষা পাচ্ছি কি?- “আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাচ্ছি না। ইন্টারন্যাশনাল বেঞ্চমার্কে পৌঁছানোর মতো মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছি বলে আমি মনে করি না।”

কেনো পাচ্ছি না?- “কারণ আধুনিক সিলেবাস-কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। এবং আন্তর্জাতিক এক্সপোজার প্রয়োজন। যাদের আন্তর্জাতিক এক্সপোজার নেই তাদের অনেককে ভিসি, প্রোভিসি করা হয়।”

আমাদের প্রতিবেশী নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে। অথচ আমাদের কেনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই- “এটিতো আমারও প্রশ্ন। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় যদি থাকতে পারে তাহলে আমাদের ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নেই কেনো? আমাদের ঘাটতিটা কোথায় সেটি বের করার জন্যে অত্যন্ত নির্মোহ বিশেষজ্ঞ টিম হওয়া দরকার।”

একইভাবে পাকিস্তানের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় রয়েছে।– “কীভাবে এটি সম্ভব যে পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় থাকে। আমার মনে হয় যে এখন এগুলোর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তুমি যা বলছ তা যথার্থই বলছো। মানসম্পন্ন শিক্ষক ও মানসম্পন্ন শিক্ষার বিষয়ে আমাদের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও খারাপও হতে পারে।”

যেসব শিক্ষক বা শিক্ষাবিদ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভালো রয়েছে বলে আত্ম-অহমিকা প্রকাশ করছেন তাদের বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?- “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রকম শিক্ষা দেওয়ার কথা আশা করি সেই মানে পৌঁছাতে পারিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। আমরা ‘গুড’-এর পর্যায়ে রয়েছি। ‘ভেরি গুড’ হতে পারিনি। তাই গুড থেকে ভেরি গুডে যেতে হলে কী করতে হবে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কোনো শিক্ষক দাম্ভিকতায় ভুগছেন- তা হয়ত ঠিক নয়। আসলে আমাকে বলতে হবে- জ্ঞানের দিক থেকে আমার চেয়ে ক্ষুদ্র কেউ নেই। আবারো বলছি, বিভিন্ন পর্যায় থেকে আমাদের বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। মোদ্দা কথা হচ্ছে- কোনো লবিং করে নয়, মেধার ভিত্তিটাকে পর্যালোচনা করার জন্যে তেমন মেধাবী লোক লাগবে।”

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এশিয়ায় মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই এর প্রধান কারণ হলো যারা জরিপ করেন তারা তথ্য-উপাত্তগুলো নেন অনলাইন থেকে। আমাদের অনলাইন অনেক শক্তিশালী না। অনেক জিনিস আছে… এখানে অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়ার ওপর ভিত্তি করে তারা তথ্য নেন। যেমন- বিদেশি শিক্ষার্থী কতোজন আছে, বিদেশি ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ কতো হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটে গেলে তথ্য-উপাত্তগুলো সেভাবে পাওয়া যায় না। তথ্য আপডেট করা হয় না। সেটি বড় কারণ।”

“বিদেশি ছাত্র ভর্তি করা বা বিদেশি ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ করা- এগুলো আমাদের একদম নাই বলা যায়। এসব কারণেই আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের সব তথ্য-উপাত্তগুলো যদি অনলাইনে দিতে পারতাম। র‌্যাঙ্কিংয়ের জন্যে যে ক্রাইটেরিয়া দরকার তা দিতে পারতাম… বা যে ক্রাইটেরিয়ার ওপর র‌্যাঙ্কিং হয় সেগুলোকে যদি অ্যাড্রেস করি তাহলে (র‌্যাঙ্কিংয়ে স্থান পাওয়া) সম্ভব হবে।”

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা কতোটুকু হচ্ছে?- “আমরা যে গবেষণায় খুব একটা পিছিয়ে আছি (তা কিন্তু না)। অনেক জায়গায় খুব ভালো গবেষণা হচ্ছে। আমরা সেগুলো যদি অনলাইনে আপলোড না করি তাহলে লোকে জানবে কেমন করে?”

আপনার দৃষ্টিতে মূল সমস্যাটি কোথায়?- “প্রথমত, আমাদের যে পারফরমেন্স রয়েছে তা আমরা জানাতে পারি না। বা আমাদের পারফরমেন্স নাই। দ্বিতীয়ত, আমাদের তথ্য-উপাত্তগুলো অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায় না।”

“এই মুহূর্তে আমার ইউনিভার্সিটিতে মাত্র একজন বিদেশি ছাত্রী ফিনল্যান্ড থেকে এসেছে। এর আগে একজন জার্মানি থেকে এসেছিলো।… অথচ আমাদের কতো ছেলেমেয়ে বিদেশে যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থী তেমন নাই।”

কেনো নেই বলে মনে করেন?- “এটি খুবই লম্বা প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিয়ারেন্স লাগে। আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে আবেদন করলে ১৫ দিনের মধ্যে ফলাফল পেয়ে যায়। আমাদের এখানে একজন বিদেশি ছাত্র ছয়মাসেও ভর্তি হতে পারে না। তাও আবার আসার পর তাদের থাকা, নিরাপত্তা, বা ওদের লাইফস্টাইল আছে- তা আমরা দিতে পারি না।”

একজন বিদেশি শিক্ষার্থীকে যে সুবিধা দিবেন তা তো একজন দেশি শিক্ষার্থীকেও দিতে হবে, তাই নয় কি?- “আমাদের সম্পদের স্বল্পতার কারণে দেশি শিক্ষার্থীদের সেসব সুবিধা দিতে পারছি না।… আমাদের এখানে ছেলেমেয়ের সংখ্যাতো অনেক বেশি। মিনিমাম সুবিধা সবাইকে দিতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি সেই মানে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এতে একটু সময় লাগছে। সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। হলের মান, খাবারের মান বাড়ানোর জন্যে চেষ্টা করছি।”

আগে কি চেষ্টা করা হতো না?- “আগের চেয়ে চেষ্টাটা এখন অনেক বেশি হচ্ছে। আগামী ১/২ বছরের মধ্যে এর দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাবে।”

সম্পদের স্বল্পতা বলতে কী বোঝাচ্ছেন?- “আমাদের মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকে, ৮০ ভাগ বাইরে থাকে। টাকা-পয়সা, পরিকল্পনার ব্যাপার আছে। আমাদের নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে সরকারের কাছ থেকে অর্থের সংস্থান করতে হবে। মানসম্পন্ন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। মানসম্পন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।”

এসব কেনো করা হচ্ছে না?- “আমি পরিকল্পনায় যাবো- আমার সেই সময় নাই। এসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া- নিজেদের গরজে এসব কাজ করতে হবে। এসব উদ্যোগী ভূমিকা থাকলে আর্থিক সমস্যা কোনো সমস্যা হবে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, “এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় কেনো বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই- এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চলছে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বায়নের ব্যাপার থাকে। যেখানে বিদেশি ছাত্র থাকবে। মাল্টিকালচারাল ব্যবস্থা থাকবে। বিদেশি শিক্ষক থাকবে। আমাদের দেশে শিক্ষকদের গবেষণা নেই বললেই চলে। আমাদের অধ্যাপকদের যোগ্যতা নিয়ে বিদেশে একজন ব্যক্তি সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। এরকম পরিস্থিতি যদি হয় তাহলে আমরা কীভাবে র‌্যাঙ্কিংয়ে আসবো? আমাদের ছাত্ররা যেভাবে আবাসিক হলে থাকে যেটি বস্তির জীবন। ছাত্রদের হল থাকবে অলমোস্ট থ্রি-স্টার হোটেলের মতো। ছাত্ররা যদি বস্তির জীবনযাপন করে তাহলে পড়াশুনা কীভাবে করবে?”

“ক্যাম্পাসে হাঁটলে কি মনে হয় আমরা কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটছি। ক্যাম্পাসে থাকবে মনোরম পরিবেশ। সুন্দর গাছ-গাছালি থাকবে। সবকিছু পরিপাটি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। তা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পাওয়া যায়? এসব কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে বিশ্ববিদ্যালয় না। এখানে কিছু ভবন আছে, কিছু শিক্ষক আছে। শিক্ষকরা সারাদিন শুধু রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকেন। গবেষণা, পড়াশুনার মধ্যে কি কেউ রয়েছেন?”

প্রতিবেশী নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?- “কিছুদিন আগে আমি নেপালে গিয়েছিলাম। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ চমৎকার। সেখানকার ছাত্রাবাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো ছাত্রাবাসের চেয়ে উন্নত। নেপালের শিক্ষকরা রাজনীতি নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকেন না। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি বিভাগ থেকে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী আমেরিকায় যায়, সারা বাংলাদেশ থেকেও অতো শিক্ষার্থী আমেরিকায় যায় না।”

“ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশি বাজেট দেওয়া হয়। শুধু নেপাল নয়, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ও সেই তালিকায় রয়েছে। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এটি আমাদের জন্যে লজ্জার।”

পাকিস্তানের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় রয়েছে।– “হ্যাঁ, ইমরান খান ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী ভবনকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বানানোর জন্যে দান করেছেন। তার লক্ষ্য হলো একটি বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে ওখানে। ওখানকার শিক্ষকরা ভারতীয় শিক্ষকদের চেয়ে বেশি বেতন পান।”

সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কী অবস্থা?- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যান তারা কেউই শখ করে যান না। ঢাকার যানজট পেরিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যাওয়াটা কোনো আরামের কাজ না। তারা বাধ্য হয়েই যান। শিক্ষকদের বেতন যদি সেভাবে দেওয়া হতো আর যদি নিয়ম বেঁধে দেওয়া হতো যে এরপর আর কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবেন না, গবেষণা করতে হবে, আর গবেষণার জন্যে টাকা দেওয়া হতো, তাহলে কেউ যেতেন না। গবেষণা করলে যদি পুরস্কৃত করা হতো, আর না করলে যদি শাস্তি দেওয়া হতো কেউ আর খণ্ডকালীন পড়াতে যেতেন না। সবকিছু মিলিয়ে একটি পরিবেশ যদি দেওয়া যায় তাহলে এর সুফল পাওয়া যাবে।”

তাহলে আমাদের মূল সমস্যা কোথায় বলে আপনি মনে করেন?- “শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগের অভাব। ইউনেস্কোর পরামর্শ- জিডিপির অন্তত ৫.৫ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করলে এটি দেশ উন্নত হতে পারে। আমরা গত ২০ বছর যাবত জিডিপির ১.৮ শতাংশ থেকে ২.১ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করি। যেখানে নেপাল ৩.৪ শতাংশ বরাদ্দ করে। শিক্ষায় আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বরাদ্দ দিয়ে থাকি। এমনকী, সারা পৃথিবীতেও সর্বনিম্ন। আফ্রিকার দেশগুলোও আমাদের চেয়ে শিক্ষাখাতে বেশি বরাদ্দ দেয়।”

The Daily Star

Leave a Reply

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x