স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের বিশেষ আয়োজন:শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ফিরে পাওয়ার গল্প” শোনালেন জামাল খান ও তার ভাইয়েরা

Posted on by

লন্ডন : মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ঘর ছাড়েন তৎকালীন ইপিআর সদস্য নুরুল হক খান। অতঃপর বিভিন্ন মারফতে খবর আসে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোথায়, কীভাবে শহীদ হয়েছেন সেসবের কিছুই জানতেন না লন্ডনের যুবনেতা ও সংস্কৃতিকর্মী জামাল খান ও তার পরিবার। এমনকি জন্মের আগে শহীদ হওয়া বাবার ছবিও দেখার সুযোগ হয়নি সর্বকনিষ্ট সন্তান জামাল খানের। ছবিতে হলেও তাঁর বাবা দেখতে কেমন ছিলেন সেই অব্যক্ত আকুতি থেকে বহুভাবে চেষ্টা ও খোঁজাখুঁজি শেষে দীর্ঘ ৪৮ বছর পর সম্প্রতি ঢাকার বিডিআর হেড-কোয়ার্টার থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে সেই বহুল কাঙ্খিত ছবি। আর সেই ছবি খুঁজে পাওয়ার কাহিনী তুলে ধরলেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। বড় ভাইয়েরা তাদের পিতা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুলৃ হক খানকে দেখেছেন, কিন্তু জামাল খানের জন্মের আগেই তার পিতার মৃত্যু হয়।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের বিশেষ আয়োজন “শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ফিরে পাওয়ার গল্প” অনুষ্ঠানে তাদের বাবা কোথায়, কীভাবে শহীদ হলেন সেই তথ্য ও ছবি খুঁজে ফেরার কাহিনী শোনালেন শহীদ সন্তান জামাল খান ও তার ভাইয়েরা।

শহীদ বাবার ছবি খোঁজে ফেরার বিস্তারিত বলতে গিয়ে জামাল খান অনেকটা আবেগে ভেংগে পড়েন বলেন, পিতা মুক্তিযুদ্ধে লড়তেই ঘর ছেড়েছেন। কিন্তু তার পরের-কিছুই জানতেন না তারা। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ ৪৮ বছর পর বাবাকে ফিরে পেলেন। তাও ছবির মাঝে। কারন তার জন্মের অনেক আগেই শহীদ হন ইপিআর নায়েক নুরুল হক খান। দুঃখ ছিলো বাবাকে দেখলেন না কোনোদিন, দেখা হবেও না,কিন্তু একটি ছবি থাকলেও তো বুঝতে পারতেন কেমন ছিলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে জামাল খানের বড় ভাই যথাক্রমে বদরুজ্জামান খান, ডেগেনহামের লেবার কাউন্সিলার সদরুজ্জামান খান, খসরুজ্জামান খান, জয়নাল আহমদ খানও উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৫ মার্চ, সোমবার লন্ডন বাংলা প্রেসক্লবের সভাপতি মুহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারী মুহাম্মদ জুবায়েরের পরিচালনায় ক্লাব আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের শুরুতে ২৫শে মার্চের কালো রাত্রী ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাক-হানাদার বাহিনী ঢাকার পিলখানাস্থ তৎকালীন ইপিআর সদর দপ্তর আক্রমণ করে। তখন বালাগঞ্জের বাড়ীতে ছুটিতে ছিলেন ইপিআর নায়েক নুরুল হক খান। কিন্তু ওয়ারল্যাসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তা পেয়ে অন্তসত্ত্বা স্ত্রীকে একা রেখেই ঘর ছাড়েন তিনি। তারপর মহান বিজয় এসেছে-মা সাত সন্তান নিয়ে কষ্টে দিনযাপন করেছেন-কিন্তু যথার্থ তথ্য পেতেন না তার স্বামীর।

মুক্তিযুদ্ধে ইপিআরের মোট ৮১৭ জন সৈনিক শহীদ হন। তার মধ্যে তাদের বাবার নামও লিস্টে রয়েছে। কিন্তু তিনি কীভাবে ও কোথায় শহীদ হন তা জানা যায়নি। চলতি বছর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে জামাল খান তার নিয়মিত খোঁজাখুঁজির অংশ হিসেবে বিডিআর হেড কোয়ার্টারে বাবার একটি ছবি পান এবং গণকবরেরও সন্ধান মিলে। অবসান হয় সব বিভ্রান্তির।

জামাল খান ও তার ভাইয়েরা শহীদ নুরুল হক খানের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের বাবার তথ্য খুঁজে পেতে সহযোগিতা করায় বাংলাদেশ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। একই সাথে এই বিশেষ আয়োজনের জন্য লন্ডন বাংলাপ্রেস ক্লাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবা হারিয়ে যাওয়ার সময়ে ১২ বছর বয়সী জামাল খানের বড় ভাই কাউন্সিলার সদরুজ্জামান খানও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তাঁর বাবা হারানোর সময়কার গল্প। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ও পরবর্তীতে সংসার সাগরে স্বামীহীন তাঁর মায়ের মানবেতর জীবনযাপনের কাহিনী অনুষ্ঠানের আগতদের কাছে তিনি তুলে ধরেন। বাবার সাথে সাথে তাঁর ছবিগুলোও হারিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে কাউন্সিলার সদরুজ্জামান খান বলেন, বাবার ছবি ও ডকুমেন্টের আশায় বারবার পিলখানায় (বিজিবি সদর দপ্তর) গেলেও আমাদের দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর জন্ম নেয়া আমাদের ছোট ভাই জামালের বাবার চেহারা দেখতে না পাওয়ার মানষিক যন্ত্রণা বারবার আমাদের পিলখানায় নিয়ে গেলেও প্রতিবারই আমাদের ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানসিক যন্ত্রনাকাতর ছোট ভাই জামালই বাবার ছবি ও ডকুমেন্ট উদ্ধার করে, এমনটি জানিয়ে সদরুজ্জামান খান এসময় কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মূল্যায়নে শেখ হাসিনা সরকারের অসামান্য ভূমিকা অতুলনীয়। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রেরণাদায়ক মূল্যায়নে বাবা হারানোর কষ্টটি এখন আমরা গৌরবের কষ্ট হিসেবে ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করি।

সদরুজ্জামান খান এসময় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর কথাও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এই স্বীকৃতি আদায়ে জেনারেল ওসমানীর অবদানও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি আমরা। এক প্রশ্নের জবাবে সদরুজ্জামান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাবা শহীদ হয়েছেন ৭২ সালে সরকারীভাবে এটি জানানো হলেও এতদিন আমরা জানতামনা বাবা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কখন, কোথায় শহীদ হয়েছেন। গত মাসে ডকুমেন্ট ও ছবি উদ্ধারের পরই আমরা জানতে পারি ১৯৭১ সালের ৫ই মে আমার বাবা শহীদ হন, এবং সিলেট ক্যাডেট কলেজে একটি গণ কবরে তাঁকে মাটিচাপা দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ১৯৭২ সালে ঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির প্রয়োজনীয় সরকারী ডকুমেন্ট প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের হাতে তুলে দেন শহীদ নুরুল হক খানের সন্তানরা।

সভাপতির বক্তব্যে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, এটাকে আমি নিছক গল্প বলতে চাই না। কারণ গল্পে অনেক কল্পনাজাত বিষয়ের মিশেল থাকে। এটাকে আমি কাহিনী বলতে চাই, যে কাহিনী আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ।

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে “শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ফিরে পাওয়ার গল্প” শুনতে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, কমিউনিটি এক্টিভিস্টসহ অনেক রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক খানের সন্তানদের বক্তব্য শোনার উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্য থেকে বিষয়টি সম্পর্কে আরো পরিষ্কার হতে প্রশ্ন উত্থাপন, প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য ব্যক্ত করেন প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও রাজনীতিবিদ সুলতান শরীফ, সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন, সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা, সাংবাদিক বুলবুল হাসান, সাংবাদিক সৈয়দ আব্দুল কাদির, সাংবাদিক আব্দুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, কাউন্সিলার আহবাব হোসেন ও কাউন্সিলার শাহ সুহেল আমিন।

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবা ফিরে পাওয়ার গল্প শোনার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বক্তারা বলেন, বিলেতের সুপরিচিতমুখ, পৃথিবীর আলো দেখার পূর্বে পিতৃহারা সন্তান জামাল খানের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবা নুরুল হক খান মূলত মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবাদেরই প্রতীক। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব এই বাবার বীরত্বগাঁথার গল্প শুনার অনুষ্ঠান আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সব বাবাদেরই সম্মান জানালো।

জামাল খানের বাবা শহীদ নুরুল হক খানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতিপয় মানুষের বিভ্রান্তি ছড়ানোর তীব্র প্রতিবাদ করে তারা বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর ১৯৭২ সালেই সরকারী স্বীকৃতি পাওয়া এমন একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায় তারা নিজের মা ও মাটিকেই মূলত অস্বীকার করে। এরা সমাজের কলঙ্ক।

উল্লেখ্য, জামাল খানের বাবা শহীদ নুরুল হক খান তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রাইফেলস, বিডিআর) একজন সৈনিক ছিলেন।

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে আগে গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুরে তিনি ছিলেন ছুটিতে। যুদ্ধ শুরু হলে দেশপ্রেমিক এ সৈনিক আর নিজেকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে পারেননি। গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে একাত্তরের এপ্রিল মাসে বেড়িয়ে যান বাড়ি থেকে।

এরপর নুরুল হক খানের আর কোনো খবর নেই। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন খবর আসতে থাকে নুরুল হক খানের পরিবারের কাছে। কেউ বলেন, তিনি গ্রেফতার হয়েছেন পাক আর্মির হাতে। কেউ বলেন, পাক আর্মির সাথে সম্মুখ সমরে নিহত হয়েছেন নুরুল হক খান।

৬ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জনক নুরুল হক খানের কিশোর বয়সী বড় দুই ছেলে বদরুজ্জামান খান ও সদরুজ্জামান খান বাবার খোঁজে চষে বেড়াতে থাকেন সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল। সাহায্যের আশায় পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর স্থানীয় শান্তি কমিটির এক নেতার কাছে গেলে তাদের অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ফেরেন বীর বেশে। কিন্তু নুরুল হক খানের কোনো খবর নেই। অবশেষে তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নুরুল হক খান মিশে আছেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে। শুয়ে আছেন সিলেট ক্যাডেট কলেজের ভেতরে একটি গণকবরে। যুদ্ধ করতে গিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে একাত্তরের ৫ মে শহীদ হন তিনি।

শহীদ নুরুল হক খানের ছোট ছেলে জামাল খানের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে, বাবার মৃত্যুর ৮ মাস পর। জন্ম থেকে মধ্য বয়স— এই দীর্ঘ সময় বাবার অবয়ব ছিল জামালের কল্পনায়। গত মাসে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে ছবি পাওয়ার পর কল্পনায় বাবার অবয়ব আঁকার সমাপ্তি হয় জামালের। বাবার চেহারা কেমন ছিলো শেষ পর্যন্ত তা জানতে পেরেছেন, এটাই জামাল খানের সবচেয়ে বড় সান্তনা এখন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনা পর্বের সমাপ্তি টানেন প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী।

দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক অুষ্ঠানের সূচনা করেন ইভেন্ট সেক্রেটারি রেজাউল করিম মৃধা। ইসি মেম্বার, কবি শাহনাজ সুলতানার উপস্থাপনায় এতে দেশাত্ববোধক গান পরিবেশন করেন প্রেসক্লাবের ইসি মেম্বার, শিল্পী রুপি আমীন, শিল্পী হীরা কাঞ্চন হীরক এবং কবিতা আবৃত্তি করেন ইসি মেম্বার, আবৃত্তিকার নাজমুল হোসাইন ও আবৃত্তিকার জিয়াউর রহমান সাকলাইন।

More News from কমিউনিটি

More News

Developed by: TechLoge

x