টেলিভিশন ও রেডিও সাংবাদিকতায় অশুদ্ধ উচ্চারণ: সমাধান কী?

Posted on by

সারওয়ার-ই আলম : টেলিভিশন ও রেডিও সাংবাদিকতায় শুদ্ধ উচ্চারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুদ্ধ উচ্চারণের অভাবে অনেক সময় শব্দের মূল অর্থ বদলে যায়। একইসাথে অশুদ্ধ উচ্চারণ শ্রুতিকটু হওয়ার কারনে তা শ্রোতাদের জন্য বিরক্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের টেলিভিশন ও রেডিও সাংবাদিকদের কেউ কেউ শব্দের উচ্চারণে এতটাই অযত্নবান যে, প্রচারিত খবরটি বাংলায় হলেও কোন কোন শব্দ বুঝতে বাংলা ভাষাভাষি শ্রোতাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। যেমন একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিবেদক বলছেন – ‘পতারক চক্রের কপ্পরে’। প্রতিবেদক এ বাক্যে ‘প্রতারক’ শব্দটির উচ্চারণ করছেন ‘ পতারক’ আর ‘খপ্পরে’ শব্দটির উচ্চারণ করছেন ‘কপ্পরে’।

অন্য একটি চ্যানেলে একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপন নিয়ে প্রচারিত খবরে ‘বাংলাভাষা’ শব্দটি শোনা যাচ্ছিল ‘বাংলাবাসা’, ভোটার শব্দটি ‘বুটার’, চোরকে বলছেন ‘চুর’ আর প্রতিবাদকে বলছেন ‘পতিবাদ’। প্রভাতফেরীর ‘ভ’ যখন ‘ব’ উচ্চারিত হয় তখন এর আবেদনই যেন হারিয়ে যায়!

আরেকজন সাংবাদিক ‘ঘনিষ্ঠ ‘ এবং ‘একনিষ্ঠ ‘ শব্দদুটিকে বার বার উচ্চারণ করছিলেন ‘ঘনিষ্ট’ এবং ‘একনিষ্ট’ বলে। ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ তার কন্ঠে শোনা যাচ্ছিল ‘ বুয়া মুক্তিযোদ্দা’। মনে হতে পারে, এ শব্দটিতে ‘দ’ এর সাথে যে ‘ধ’ যুক্ত হয়ে ‘যোদ্ধা’ শব্দটি তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে হয় তিনি অবগত নন, নতুবা ‘ধ’ উচ্চারণে যে শ্বাসাঘাত দিতে হয় সে বিষয়ে তার সম্যক ধারনা নেই।

‘প্রতিবাদ’ শব্দটিকে কোন কোন টিভি সাংবাদিক ‘পতিবাদ’ উচ্চারণ করেন।র-ফলাটি বেমালুম বাদ দিয়ে যান। অনেকে আবার উচ্চারণ করেন ‘প্র’। এ শব্দটির সঠিক উচ্চারণ হবে ‘প্রোতিবাদ’।

অন্য একটি চ্যানেলে একজন উপস্থাপক বাংলাদেশের মন্ত্রীদের দুর্নীতির বিষয়ে মন্তব্য করতে যেয়ে বলছেন- সবাই চুর। চোর শব্দটি কি এতোটাই কঠিন যে ‘চুর’ বলতে হবে। রাজনীতির খবর তার কন্ঠে শোনা যাচ্ছিল ‘রাযনিতির কবর’। পুরো অনুষ্ঠানটিতে তিনি সংসদের অধিবেশনকে ‘ সংসদের অদিবেশন’ উচ্চারণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর ‘প্র’ তার কন্ঠে ‘প’ হয়ে যাওয়ার কারনে ‘পদানমন্ত্রী’ শোনা যাচ্ছিল।

অপর এক সংবাদে কঠোরকে প্রতিবেদক উচ্চারণ করছিলেন ‘কটোর’ আর ব্যবস্থাকে ‘ব্যবস্তা’।

বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি উচ্চারণেও বিভ্রাট কানে বাজে। স্ট্রেট ডায়ালগকে কোথাও উচ্চারিত হতে শুনি ‘স্টেট ডায়ালগ’, ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘মেজিস্টেট’ আর সুপারইনট্যানডেন্টকে ‘সুপারিনট্যান্ট’ শুনতে কার ভাল লাগবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে প্রতিবেদক অসংখ্যবার ভিসি শব্দের উচ্চারণ করছিলেন ‘বিসি’ আর ঢাকা মেট্রোপলিটনকে উচ্চারণ করছিলেন ‘মেট্টোপলিটন’।তিনি হয়তো খেয়ালই করেননি যে মেট্রোপলিটনে ‘ট’-এর সাথে ‘ট’ নয়, যুক্ত হয়েছে ‘র-ফলা’। ইংরেজী ব্রিজকে ‘ব্রিয’ আর ফ্রিজকে ‘ফ্রিয’ শুনতে শুনতে আমরা অনেকে হয়তো ইতোমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

দু:খজনক হলেও সত্য যে বিভিন্ন চ্যানেলে বছরের পর বছর এসব ভুল উচ্চারণ চলেই আসছে। অথচ একটু যত্নবান হলেই সাংবাদিকগণ এ সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যারা ভুল উচ্চারণ করেন, তাদের সমস্যা হয় মূলত ক ও খ, গ ও ঘ, চ ও ছ, জ ও ঝ, ট ও ঠ, ত ও থ, দ ও ধ, প ও ফ, ব ও ভ এবং র-ফলা ও ঋ-কার নিয়ে।

যেমন: ধরা যাক, খ-এর উচ্চারণ। খবর উচ্চারণে এটি বার বার আসে। সুতরাং এ একটি অক্ষর সঠিকভাবে উচ্চারণ করা আয়ত্ত্ব করতে পারলে অনেক বড় ঝামেলা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

ক এবং খ উচ্চারণে মূল পার্থক্য হলো- ক অল্প প্রাণ বর্ণ, এটি উচ্চারণে কোন বলপ্রয়োগ নেই, এটি জিহ্বার একেবারে সম্মুখভাগ থেকে উচ্চারিত হয় স্বরবর্ণ ‘ অ’ সহযোগে, মুখ থেকে সবেগে বাতাস বের হয় না। অপরদিকে খ হলো মহাপ্রয়াণ বর্ণ, উচ্চারণে আমাদেরকে জিহ্বায় খানিকটা বলপ্রয়োগ করে বলতে হয়, এটি উচ্চারিত হয় ব্যন্জনবর্ণ ‘হ’ সহযোগে, উচ্চারণের সময় মুখ থেকে বাতাস বের হয় যা মুখের সামনে হাতের তালু রাখলে অনুভব করা যায়। ভুল উচ্চারণের কারনে খবর কিন্তু কবর হয়ে যেতে পারে। তাই সতর্কতা জরুরী।

উচ্চারণ রীতিতে অল্প প্রাণ এবং দীর্ঘ প্রাণ বলে দু’টি কথা প্রচলিত আছে। অল্প প্রাণ বলতে বোঝায় অল্প শ্বাস। অর্থাৎ যে সকল বর্ণ উচ্চারণে জিহ্বায় আঘাত করে মুখ থেকে বাতাস বের করে দিতে হয় না, তারা হলো অল্প প্রাণ। যেমন: ক, গ, চ, জ, ট, ড, ত, দ, প এবং ব। এ দশটি বর্ণ উচ্চারিত হবে ‘অ’ সহযোগে। অর্থাৎ উচ্চারণ করতে ‘অ’ শোনা যাবে, যেমন: ক-অ, গ-অ, চ-অ, জ-অ, ট-অ, ড-অ, ত-অ, দ-অ, প-অ এবং ব-অ। নিজে নিজে চর্চা করা সময় মুখে সামনে হাতের তালুটি ধরুন। যদি দেখেন তালুকের বাতাস এসে ধাক্কা দিচ্ছে তাহলে বুঝবেন উচ্চারণ সঠিক হচ্ছে না, কারণ এগুলো উচ্চারণে সবেগে বাতাস বের হবে না।

অপরদিকে, খ, ঘ, ছ, ঝ, ঠ, ঢ, থ, ধ, ফ এবং ভ হলো দীর্ঘপ্রাণ বর্ণ। আরেকটু পরিষ্কার করে যদি বলি, তাহলে বলতে হয় এ বর্ণগুলো উচ্চারণের সময় মুখ থেকে সবেগে বাতাস বের করে দিতে হয়। এ বর্ণগুলো উচ্চারিত হবে ‘ হ’ সহযোগে। যেমন: খ-হ, ঘ-হ, ছ-হ, ঝ-হ, ঠ-হ, ঢ-হ, থ-হ, ধ-হ, ফ-হ এবং ভ-হ। নিজে নিজে চর্চা করার সময় মুখের খুব কাছাকাছি হাতের তালুটি ধরুন।যদি অনুভব করেন শ্বাস আঘাত করছে তালুতে এসে, বুঝবেন উচ্চারণ সঠিক হচ্ছে।

ও-কার এবং উ-কার জনিত ভুলের কারনে অনেকে চোরকে ‘চুর’ এবং ভোটারকে ‘বুটার’ উচ্চারণ করেন। মনে রাখতে হবে চ-এর সাথে ও-কার যুক্ত হয়ে ‘চোর’ হয়েছে, উ-কার নয়। উ-কার হয় তখন, যখন আমরা বলি ‘ভাঙচুর’।একই নিয়ম প্রযোজ্য ভোটার-এর ক্ষেত্রে। খেয়াল রাখতে হবে- প্রথম বর্ণটি ব নয় ভ এবং উ-কার নয় যুক্ত হবে ও-কার।

র-ফলা উচ্চারণ জনিত সমস্যা দূর করতে খানিকটা সতর্কতায় যথেষ্ট।প্রতিবেদন, প্রদান, প্রতিবাদ, প্রধানমন্ত্রী- এ শব্দগুলো একজন টিভি ও রেডিও সাংবাদিককে প্রায়শ: ব্যবহার করতে হয়। একবার ঠিক করে নিলে পরবর্তীতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে- প বর্ণটি কিন্তু এখানে একা নয়। তার সাথে রয়েছে র-ফলা। তাই শুধু প উচ্চারিত হবে না, র-ফলা সহযোগে এর উচ্চারণ হব ‘প্রো’। ‘প্রধানমন্ত্রী’ উচ্চারণে আরো দু’বার মনযোগ দিতে হবে। কারণ এটি দ নয় ধ, যার উচ্চারণে শ্বাসাঘাত দরকার হবে এবং শেষ পর্যায়ে এসে লক্ষ্য রাখতে হবে যে মন্ত্রীতে ‘ন’-এর সাথে যে ‘ত’ আছে, তার সাথে র-ফলা যুক্তি আছে। সুতরাং শুধু মন্তী হবে না, হবে মন্ত্রী।

আস্থা, স্থিতি, প্রতিস্থাপন, উপস্থাপক- এসকল শব্দের উচ্চারণে অনেকে ‘স্থ’কে ‘ত’ সহযোগে উচ্চারণ করেন। এটি শব্দের মূল বানান সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। মনে রাখা দরকার যে, এখানে স-এর সাথে ‘ত’ নয় যুক্ত হচ্ছে ‘থ’; যার উচ্চারণ হবে হ-সহযোগে। অর্থাৎ থ-হ। সুতরাং ‘উপস্তাপক’ নয়, উচ্চারণ হবে উপসথাপক, আস্তা নয় আসথা। এখানে মনে রাখতে হবে যে ‘রাস্তা’ বানানে কিন্তু এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। কারণ রাস্তায় ‘স’-এর সাথে ‘থ’ নয় যুক্ত হয়েছে ‘ত’।

যুদ্ধ, যোদ্ধা, সিদ্ধান্ত, বন্ধু, বন্ধ, গন্ধ, প্রবন্ধ- প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণ শুরুর দিকে খানিকটা জটিল মনে হলেও অল্প ক’দিনের চর্চাতেই সে সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। শুধু মনে রাখতে হবে যে- এ সকল শব্দে ‘দ’ কিন্তু একা নয়, সে যুক্ত হচ্ছে দীর্ঘ প্রাণ ‘ধ’-এর সাথে; যার উচ্চারণে শ্বাসাঘাত হবে।
একই নিয়ম মেনে কঠোরকে ‘কটোর’ বলা থেকে বিরত থাকা সম্ভব।

উচ্চারণরীতি নিয়ে বর্তমানে অনলাইন-এ বিনামূল্যে অসংখ্য ভিডিও পাওয়া যায়। এসকল ভিডিও সঠিক উচ্চারণ চর্চায় কাজে লাগানো হলে খুব দ্রুতই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। একইসাথে টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেল-এর সাংবাদিক ও উপস্থাপকদের জন্য স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেও এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। স্থানীয় প্রেস ক্লাবগুলোও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। সাংবদিকতার গুণগত মান উন্নয়নে এটি অপরিহার্য।

সারওয়ার-ই আলম
কবি ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x