এক নজরে ডাকসু-নিউইয়র্ক থেকে ড ওমর ফারুক।

Posted on by

নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক ওমর ফারুকের ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ইংরেজি’তে Dhaka University Central Students’👩‍🎓 👨‍🎓 Union (DUCSU) বা (ডাকসু) প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯২২ সালে। তবে ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম ডাকসু নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে অবশ্য নির্বাচন না হয়ে মনেনীত ভিপি-জিএস দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৫৩ সালে প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়। সে অনেক লম্বা কথা। আমি চলে আসি সাম্প্রতিক সময়ের দিকে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর এবার ১১ মার্চ ২০১৯ অনুষ্ঠিত হল ডাকসু নির্বাচন। হাসিনা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কি করেছে এবং ডাকসু নির্বাচনেও, সে বিতর্কে না গিয়ে আমি এটুকু বলতে পারি, তবুও ত তিনি অবশেষে একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেন। এর আগে খালেদা ও নিজামীদের নেতৃত্বাধীন জোট এবং হাসিনার প্রথম বার ‘৯৬ সালে জামায়াতের সহযোগিতায় ক্ষমতায় এসেছিল, কেন জানি উভয় সরকারই নির্বাচিত প্রতিনিধি ডাকসু’তে দায়িত্ব পালন করুক, তা চায় নি। এবার হাসিনা জাতীয় নির্বাচনে দিনের আলোতে ভোটের বদলে রাতে ব্যালট বাক্স পূরণের মজা পেয়ে ডাকসু নির্বাচনটাও সেভাবে সেরে যেতে প্রয়াসী হয়। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি’কে সময়ের পরিক্রমায় তিনি এ দলটিকে বর্তমানে একটা আধা ভাঙ্গা ও ক্লিবলিঙ্গ স্টাইলে পরিণত করতে সমর্থ যেমন হলেন, তেমনি ছাত্রদলটিকেও। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই একটা বিরোধীদল, যে দলের নেতা ও কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা ট্রেনে ভ্রমণকারী যাত্রীদের মত। অর্থাৎ একজনের সাথে অন্য জনের সম্পর্ক অনেকটা স্বল্প মেয়াদী, ক্ষণস্থায়ী এবং ভঙ্গুর। কে যে প্রকৃতই দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে মনে প্রাণে ধারণ করে দল করে, অন্ক সময় দলের দীর্ঘদিনের নেতা ও কর্মীরাও আবিষ্কার করতে সমর্থ নয়। এ বিষয়টি সম্পর্কে স্বয়ং দলীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বারংবার ইঙ্গিত করেছেন। অন্যরাও। এত কিছুর পরও দলটির জন্য সাধারণ জনগণের মাঝে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়া এবং ঘাতকদের হাতে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নী বেগম খালেদা জিয়ারও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এখনও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি নামক দলটিই ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি বলেই অভিজ্ঞজনরা মনে করেন। যাই হোক, এমন প্রেক্ষাপটে সরকার খেলা রঙের ডঙ মনে করে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করল।প্রসঙ্গক্রমে বলি, ছাত্রশিবির নামে আরেকটি সংগঠন রয়েছে, যে সংগঠনটি মূলত এসব সংগঠনগুলোর মত অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খল নয়। তাদের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ও দমন নিপীড়ন চলে। এরপরও ছাত্রলীগের সে সংগঠন সম্পর্কে অনেক বেশি আতঙ্ক কাজ করে। যদিও সে সংগঠন বা ছাত্রদলেরও কোন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।
এবারের ডাকসু নির্বাচনের আগেও এমন ধরনের বা এর চেয়েও বড় ধরনের কলঙ্কিত ইতিহাস ডাকসু নির্বাচনের রয়েছে।
সেটি মহিউদ্দিন আহমদের লেখায় যেভাবে ফুটে উঠেছে। [লেখাটি’র Courtesy Facebook
Farid Gazi 12 March 2019 এবং Zoglul Husain]
ভোট ডাকাতি আর ভোট চুরি আওয়ামী লীগের পুরাতন স্বভাব। নতুন প্রজন্মের অনুসন্ধিৎসু পাঠক ও একটিভিস্টদের জন্য লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ-এর লেখা বই থেকে কিছুটা উদ্ধৃত হল:
“… তেহাত্তরের ৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে নির্বাচন করে। তাদের প্যানেলে ডাকসুর সহ-সভাপতি প্রার্থী ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নূহ-উল-আলম লেনিন এবং সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন ছাত্রলীগের ইসমত কাদির গামা। পক্ষান্তরে জাসদ-ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক ও জহুর হোসেন। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় ভোট গণনার সময় দেখা গেল, মাহবুব-জহুর পরিষদ বিপুল ভোটে এগিয়ে। তাদের জয় সুনিশ্চিত। হলগুলোতেও অবস্থা একই রকম। রাত আটটার দিকে লেনিন-গামার সমর্থকেরা ভোট গণনার কেন্দ্রগুলোতে হামলা করে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে এক হল থেকে অন্য হলে যান। প্রতিপক্ষ দলের ছাত্ররা এবং ভোট গণনার কাজে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা আতঙ্কিত হয়ে যে যেদিকে পারেন পালিয়ে যান। এ প্রসঙ্গে ‘মুজিববাদী ছাত্রলীগে’র একজন কর্মীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করা যেতে পারে :
‘… সন্ধ্যার পর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে আমরা মিছিল নিয়ে বের হয়েছি। সেদিন আমাদের সাথে ৫০-৬০ জন নেতৃস্থানীয় নেতা-কর্মী ছিল। এদিকে নির্বাচনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থিত পরিষদ জয়ী হতে পারে আর মুজিবপন্থী পরিষদ পরাজিত হতে চলেছে এমন খবর পেয়ে শেখ কামাল ডাকসুর বাক্স ছিনতাই করে। মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় আমরা দেখি শেখ কামাল বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে রযেছে। তার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা, শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। তার পায়ের কাছে কয়েকটি ব্যালট বাক্স। শেখ কামালের আশপাশে কয়েকজন বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মিছিল নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার আগে আমরা ধারণাও করিনি যে শেখ কামাল ইতিমধ্যে ডাকসুর বাক্স ছিনতাই করে ফেলেছে। (ইজাজ আহমেদ বিটু / হতভাগা জনগণ – প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ, রাঢ়বঙ্গ, রাজশাহী)।’
… ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সেটা ছিল একটা কলঙ্কজনক দিন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠন জিতে যাবে, এটা মেনে নেওয়ার মতো উদারতা আওয়ামী লীগ সরকারের ছিল না। জাসদ থেকে অভিযোগ করা হয়, সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরীর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি কোনো রকমের ব্যবস্থা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে সরকারে যোগ দেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান॥”
[ সূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা। প্রকাশকাল অক্টোবর, ২০১৪, পৃ: ১০৫-১০৬ ]
বিগত বছরগুলোতে ভিপি-জিএস পদে কারা নির্বাচিত হয়েছিলেন।

  • ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর প্রথম ভিপি হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।
  • ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। জিএস হন এ কে মুখার্জি (ভারপ্রাপ্ত এ বি রুদ্র)।
  • ১৯২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন এএম আজহারুল ইসলাম। জিএস হন এস চক্রবর্তী।
  • ১৯২৯-৩২ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন রমণী কান্ত ভট্টাচার্য। যৌথভাবে জিএস হন কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান।
  • ১৯৩২-৩৩ ও ১৯৩৩-৩৪ শিক্ষাবর্ষে জিএস হন ভবেশ চক্রবর্তী।
  • ১৯৩৫-৩৬ ও ১৯৩৬-৩৭ শিক্ষাবর্ষে জিএস হন এ এইচ এম এ কাদের।
  • ১৯৩৮-৩৯ শিক্ষাবর্ষে জিএস হন আব্দুল আওয়াল খান।
  • ১৯৪১-৪২ শিক্ষাবর্ষে জিএস হন আব্দুর রহিম।
  • ১৯৪৫-৪৬ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আহমদুল কবির (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ)। জিএস হন সুধীর দত্ত।
  • ১৯৪৬-৪৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ফরিদ আহমেদ। জিএস হন সুধীর দত্ত।
  • ১৯৪৭-৪৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন অরবিন্দ বোস। জিএস হন গোলাম আযম (জামায়াত নেতা ও ‘৭১ এর ভূমিকা নিয়ে দণ্ডিত)।
  • ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন এস এ বারী। জিএস হন জুলমত আলী খান (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ)।
  • ১৯৫৪-৫৫ ও ১৯৫৫-৫৬ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন নিরোদ বিহারী নাগ। জিএস হন আব্দুর রব চৌধুরী।
  • ১৯৫৬-৫৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন একরামুল হক। জিএস হন শাহ আলী হোসেন।
  • ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বদরুল আলম। জিএস হন ফজলী হোসেন।
  • ১৯৫৮-৫৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আবুল হোসেন। জিএস হন এ টি এম মেহেদী।
  • ১৯৫৯-৬০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আমিনুল ইসলাম তুলা। জিএস হন আশরাফ উদ্দিন মকবুল।
  • ১৯৬০-৬১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বেগম জাহানারা আক্তার। জিএস হন অমূল্য কুমার।
  • ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন এস এম রফিকুল হক। জিএস হন এনায়েতুর রহমান।
  • ১৯৬২-৬৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ। জিএস হন কে এম ওবায়েদুর রহমান।
  • ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন রাশেদ খান মেনন। জিএস হন মতিয়া চৌধুরী।
  • ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন বোরহানউদ্দিন। জিএস হন আসাফউদ্দৌলা।
  • ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। জিএস হন শফি আহমেদ।
  • ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মাহফুজা খানম। জিএস হন মোরশেদ আলী।
  • ১৯৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন তোফায়েল আহমেদ। জিএস হন নাজিম কামরান চৌধুরী।
  • ১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আ স ম আবদুর রব। জিএস হন আব্দুল কুদ্দুস মাখন।
  • ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৭৯ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। জিএস হন মাহবুব জামান।
  • ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন মাহমুদুর রহমান মান্না। জিএস হন আখতারুজ্জামান।
  • ১৯৮২-৮৩ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আখতারুজ্জামান। জিএস হন জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু।
  • ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। জিএস হন মুসতাক হোসেন।
  • ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন আমানউল্লাহ আমান। জিএস হন খায়রুল কবীর খোকন।
    উল্লেখ্য, তালিকাটি ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে নেওয়া। কয়েকটি শিক্ষাবর্ষে ভিপির নাম পাওয়া যায় নি।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x