নতুন প্রজন্ম ,একজন মইনুল হোসেন ও তার বাবা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চিনে নাও !

Posted on by

আব্দুর রহিম মিয়ার ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত  
গত পরশু দিন শেখ হাসিনা সাংবাদিক সন্মেলনে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন – ‘মইনুল হোসেনের বাবা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া যখন যা লাগতো শেখ মুজিবের পরিবারের কাছ থেকে চেয়ে নিতো, তফাজ্জল হোসেন পান্তা ভাত খেতেন আর উনার ছেলে হয়ে মইনুল ইসলাম খুবই উচ্চ বিলাসী ছিলেন’ ।
জানিনা প্রজন্ম শেখ হাসিনার দেওয়া এই পরিচয় কতটা বিশ্বাসের সহিত আমলে নিয়েছে ! কিন্তু প্রজন্ম কি আসলেই জানে কে এই মইনুল হোসেন ও তার বাবা তফাজ্জল হোসেন মানিক কে ছিলেন ? একজন মইনুল হোসেনকে চিনতে হলে আগে জানতে হবে একজন তফাজ্জল হোসেনের ইতিহাস ।
হে প্রজন্ম এসো, আজ জেনে নাও একজন তফাজ্জল হোসেন মানিকের আসল পরিচয়-
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিল্পী, সবচেয়ে বড় কলমযোদ্ধা। রাজনীতি ও সাংবাদিকতার একটি অনন্য সেতুবন্ধন নির্মাণ করেন তিনি। তিনি ছিলেন মূলত রাজনীতিক, কিন্তু কার্যত সাংবাদিক। ১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে মানিক মিয়া বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করতে হলে আমাদের মতো সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধির লোকদের একই সময় সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা চলে না।’ মূলত ১৯৫৩ সালে মানিক মিয়া সাংবাদিকতা জীবন গ্রহণের পর থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন কিন্তু রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিলেন না। প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র অনুসারী, পরে শেখ মুজিবুর রহমানে স্বাধিকার আন্দোলনের সহযোগী। কিন্তু সরাসরি তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। দলের কোনো পদ নেননি। আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্রীয় কোনো সরকারের মন্ত্রিত্বের পদ গ্রহণ করেননি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মানিক মিয়াকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একটি পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তাতে রাজি হননি।
তিনি দলীয় রাজনীতিকের ভূমিকায় অবস্থান নেননি। তাঁর অবস্থান ছিল জাতীয় রাজনীতিতে; আরও ভালোভাবে বলতে গেলে বলা চলে গণতান্ত্রিক জাতীয় রাজনীতিতে। সাংবাদিক হিসেবে মানিক মিয়া আরেকটি নামে পরিচিত ছিলেন—‘মোসাফির’। ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে লেখা তাঁর যে কলাম বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে) গণজাগরণের ঝড় সৃষ্টি করেছিল সেই কলামের লেখকের নাম মোসাফির। মানিক মিয়া পুরোদস্তুর রাজনৈতিক হলেও, মোসাফির কিন্তু রাজনৈতিক ছিলেন না। মানিক মিয়া ও মোসাফিরের মধ্যে একটি দ্বৈতসত্তা ছিল এবং তা ছিল ভিন্ন। মূলত বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনিই প্রথম অনুভব করেছিলেন, ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ভিত গড়ার পিছনে রয়েছে তাঁর বিশাল অবদান।
মানিক মিয়া রাজনীতিকে দেখতেন গণমানুষের অংশগ্রহণে একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠানরূপে। রাজনীতিকে একটি পবিত্র ব্রত হিসেবে দেখতেন তিনি। তিনি মনে করতেন, দেশের মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষা থেকেই এই ব্রত গ্রহণের প্রেরণা জন্মায়। রাজনীতিকে যারা আত্মোন্নতির বা ভাগ্যোন্নতির অবলম্বন বলে ভাবেন, তাদেরকে তিনি রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ বা কন্ট্রাক্টরি করতে বলেছিলেন। গণকল্যাণের রাজনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতিকে তিনি আলাদা করে দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবেই ক্ষমতা লাভের উপায় কিন্তু উদ্দেশ্য নয়। যাঁরা একে উদ্দেশ্য করে তোলেন তাঁরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, গণকল্যাণের রাজনীতি করেন না।’
নেপোলিয়ান বোনাপার্টের মতে, ‘এক লাখ সৈনিকের চেয়ে আমি তিনটি সংবাদপত্রকে বেশি ভয় করি।’ আর সংবাদপত্রের সম্পাদক যদি হয় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মতো ক্ষুরধার কলম সৈনিক তাহলে শাসকের ভয়ের পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। গণতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার মুক্ত গণমাধ্যম। সেই গণতন্ত্রের আদর্শ বা দর্শন প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রূপকার বাংলার ছাত্র-জনতা, আর ভাষা আন্দোলন হতে উত্্সারিত জাতীয়তাবাদের মুখপত্র হিসেবে লড়াই করতে থাকে ইত্তেফাক। ৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার করে এবং যুক্তফ্রন্টের মৌলিক দাবিগুলোকে গণমুখী করে ইত্তেফাক। মূলত যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারকে নিয়ে পশ্চিমা শাসনের একটি বিরোধী শক্তির আবির্ভাবের জন্য ব্যাপক জনমত তৈরি করে ইত্তেফাক, যা পশ্চিমাদের পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে। ৫৮-এর আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তৈরি করে। ৬৬-তে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন মানিক মিয়া এবং মানিক মিয়ার ইত্তেফাক বাঙালির জাতীয় মুক্তির সনদ এই ছয় দফার সবচেয়ে বড় প্রচারপত্র ছিল। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে পশ্চিমা শাসকদের রাজনৈতিক পরাজয়ের সাথে সাথে নৈতিকতারও চরম বিপর্যয় ঘটে, এখানেও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আবর্তনের মধ্যে মানিক মিয়া ছিলেন। ষাটের দশকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি যেসব রাজনৈতিক কলাম দৈনিক ইত্তেফাকে লিখে গেছেন, তা পড়লে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কত তীক্ষ� মেধা, সত্ সাহস আর দূরদর্শিতা থাকলে একজন কলমযোদ্ধা তত্কালীন সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান তথা আমাদের নিরীহ মানুষের পক্ষে অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মানিক মিয়া তাঁর মোসাফিরের কলামে ১৯৬৬ সালের জুন মাসে লেখেন, ‘মানুষের হাত-পা ভাঙ্গা অবস্থায় জীবন-ধারণ যেমনি যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি বাক-স্বাধীনতা, সাধারণ নিরাপত্তা এবং সংবাদপত্রের অধিকার খর্বিত হইলে উহা মানুষের মনকে পীড়িত এবং সংবাদপত্র পরিচালনায় বিড়ম্বনাস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। সংবাদপত্র যদি জনগণের সমস্যা, গণমনের জিজ্ঞাসা এবং দেশের চলতি ঘটনাপ্রবাহের উপর স্বাধীনভাবে খবরাদি পরিবেশন করিতে না পারে, সংবাদপত্রকে যদি বিধি-নিষেধ ও কড়া আইনের অনুশাসনের মধ্যে কাজ করিতে হয় তাহা হইলে সংবাদপত্র পরিচালনার কোনো সার্থকতা থাকে না। বিশ্বসুন্দরী কিংবা অর্ধ উলঙ্গ ছবি ছাপিয়া অথবা পাতায় পাতায় গুরুত্বহীন সংবাদের উপর বড় বড় টাইপের ব্যানার হেডলাইন আঁটিয়া কিংবা দেশীয় সমস্যা ছাড়িয়া বিদেশি সমস্যা নিয়া ঝুলাঝুলি করিয়া সংবাদপত্র জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে পরিচালিত করিবার নিষ্ফল চেষ্টা চালাইতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সাংবাদিকতা করিয়া সংবাদপত্র দেশবাসীর আস্থা অর্জন এবং জনমতকে সুপথে পরিচালিত করিতে পারে না। সংবাদপত্রের উপর হামলা করা কিংবা সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা ক্ষমতাসীন মহলের দুর্বলতারই প্রমাণ। কিন্তু ইহা জানিয়া-শুনিয়াও দুর্বল ক্ষমতাসীন দল অতীতেও এদেশের সংবাদপত্রের উপর হামলা চালাইয়াছে, আজিকার শাসকরাও সেই পথ অনুসরণ করিয়াছেন; বরং বর্তমান শাসককুলের থাবা আরও বড়।’ মানিক মিয়ার উপর্যুক্ত কথাগুলো আজকের প্রেক্ষাপটেও খুবই প্রাসঙ্গিক।
কলামিস্ট মোসাফির জাতীয় স্বার্থে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কলম চালিয়েছেন। দলের স্তুতি করেননি। আবার রাজনীতিক মানিক মিয়া গণরাজনীতি করেছেন । তিনি ছিলেন গণরাজনীতি ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অতন্দ্রপ্রহরী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিব প্রথম ক্যাবিনেটে সংসদ ভবনের সামনের সড়কটিকে ‘মানিক মিয়া এভিনিউ’ নামকরণ করেন। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে মনে হচ্ছে মানিক মিয়া শুধু ওই নামকরণেই আটকে আছে, তাঁর সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানার পরিধি খুবই কম এবং জানানোর উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
মানিক মিয়াকে আমরা কেবল সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছি। মানিক মিয়ার জীবনী, তাঁর কর্মতত্পরতা, সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার অবদান—ইত্যকার ভাবনা-গবেষণায় আমাদের কোনো মৌলিক সংযুক্তি নেই। প্রথাগত নোট, কয়েকটি বই আর পেপার কাটিংকে সম্বল করে আমরা মানিক মিয়াকে বুঝি। আজ মাসুদা ভাট্রি মুন্নি সাহা সহ যে সকল সাংবাদিকরা মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলায় দিয়েছেন তারা জানেনই না বাংলাদেশে আজকের যে বিশাল গণমাধ্যম কাজ করছে, তার ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন মানিক মিয়া, তাই সেই ইতিহাস ছাড়া সাংবাদিকতা পাঠের কারিকুলাম কার্যত পূর্ণাঙ্গ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা পাঠের কারিকুলামের শুরুতে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সেই ভিত গড়ার ইতিহাস, সেই কারিগরদের কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে হবে। কারণ সেখানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রয়েছে।
আর সেই জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিল্পী, সবচেয়ে বড় কলমযোদ্ধা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সন্তানই হলেন ব্যারিস্টার মইনুল । যিনি লন্ডন থেকে বার,এট,ল শেষ করে বাংলাদেশে আইন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন । বাবার আদর্শে নিজেকেও গড়েছেন একজন রাজনৈতিক, শিল্পী ও সাহসী কলমযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন । ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবের বাকশালকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আওয়ামীলীগের সংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করে বাকশাল বিরোধী জোটে অংশগ্রহণ করে মানুষের পাশে দাঁড়ান ।
আর সেই মইনুল হোসেনকে আজ শেখ হাসিনা প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন একজন উচ্চ বিলাসী ও বাজে চরিত্রের বদনাম দিয়ে। প্রজন্ম একজন মইনুল হোসেনকে চিনতে হলে ও জানতে হলে আগে তোমাকে চিনতে হবে কে ছিলেন একজন তফাজ্জল হোসেন মানিক ? কে ছিলেন মইনুল হোসেনের বাবা?

More News from ফেসবুক থেকে

More News

Developed by: TechLoge

x