বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ : দায়ী মাদক ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা

Posted on by

নিউজ  লাইফ ডেস্ক :: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’ (এমএসভিএসবি) শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। এ বিচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি এগিয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালাক বা বিচ্ছেদের ঘটনা দিনদিন বেড়ে যাওয়ার পেছনে মাদকের বিস্তার, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, নারীর উপার্জিত অর্থ স্বাধীনভাবে ব্যয়ে বাধা, পারিবারিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের ঘাটতি বড় ভূমিকা রাখছে।

বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে বিবাহিত ও তালাকপ্রাপ্ত পুরুষ উভয়ই বেড়েছে। বিবাহিত পুরুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপত্নীক পুরুষের সংখ্যাও বেড়েছে। তালাকপ্রাপ্ত ও বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা পুরুষের হার ২০১৬ সালে ছিল শতকরা ১ দশমিক ৪ শতাংশ। পরের বছর সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশে। এই হার ৫ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে দশমিক ৪ ভাগ।

একই সঙ্গে নারীদের বিবাহ, তালাক ও পৃথক বসাবাসের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশের ১০০ জন নারীর মধ্যে বতর্মানে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী তালাকপ্রাপ্ত, যা আগের বছর ছিল ১০ শতাংশ। গত ৫ বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ২ ভাগ।

২০১৭ সাল পর্যন্ত হিসাব অনুসারে দেশের মোট বিবাহযোগ্য পুরুষ জনসংখ্যার ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ। ১০ বছরের বেশি বয়সীদের বিয়ের হিসাব কষে এ হার বের করা হয়েছে।

বিবিএসের প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বে থাকা এমএসভিএসবি প্রকল্পের পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক জাগো নিউজকে বলেন, দেশে পুরুষ ও নারীর বিবাহের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে বিচ্ছেদের হারও বেড়েছে। ২০১৭ সালে দেশে পুরুষের বিবাহের গড় বয়স ছিল ২৫ দশমিক ১ বছর। এটা ২০১৬ সালে আরেকটু বেশি ছিল ২৫ দশমিক ২ বছর। তবে নারীদের বিয়ের গড় বয়স আগের মতোই রয়েছে – ১৮ দশমিক ৪ বছর।

বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের কারণকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এর মধ্যে একটি মূখ্য কারণ হলো- নারীর আর্থিক সক্ষমতা। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটা পজেটিভ। তবে এই অর্থ স্বাধীনভাবে ব্যয়ে বাধা আসে, অনেক সময় শৃঙ্খলভাবে হয় না। মানে হলো- বিশৃঙ্খল জীবন বিচ্ছেদের বড় কারণ। দেখা যায়, কর্মজীবী নারীদের মধ্যে এই বিচ্ছেদের হার বেশি।

আরেকটি গৌণ কারণ রয়েছে। সেটি হলো- শহুরে জীবনে পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কম থাকা। ফলে সহজেই বিচ্ছেদটা করতে পারে শহুরে নারী বা পুরুষরা। যেটা গ্রামে করা কঠিন। ফলে গ্রামে বিচ্ছেদটা সহজে হয় না। সামাজিক কারণেই তাদের সহ্য করার মানসিকতা বেশি থাকে।

সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন সায়েম সাবু। বিবাহ বিচ্ছেদের নানাবিদ কারণের সঙ্গে তিনি মাদকের বিস্তৃতিকে অন্যতম বড় কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্নে মৌলিক অধিকার। কিন্তু দেখতে হবে আসলে কী কারণে এই বিচ্ছেদ ঘটছে এবং এর মধ্য দিয়ে মানুষের আদৌ স্বাধীনতা ঘটছে কি না?

মাদকের প্রভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের মাত্রা এখন ভয়াবহ জানিয়ে তিনি বলেন, এটি বিচ্ছেদের বড় কারণ। বিশেষ করে বিয়ের পর নেশাগ্রস্ত স্বামীর প্রতি স্ত্রী আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। একজন নেশাগ্রস্ত মানুষ নানা অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারেন। নেশায় আক্রান্ত মানুষ শারীরিকভাবেও ধীরে ধীরে অক্ষম হয়ে ওঠে। সংগত কারণে একজন নারী ওই পুরুষের কাছে জীবন ও সংসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না। তখন বিচ্ছেদ আবশ্যক হয়ে ওঠে। নারীদেরও কেউ কেউ নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের কারণেও বিচ্ছেদ ঘটছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আদনান রহমান মনে করেন সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ প্রযুক্তির উৎকর্ষতা। তিনি বলেন, ইন্টারনেট বা প্রযুক্তির প্রতি ঝোঁক বাড়ার কারণে স্ত্রীকে সময় দেন না স্বামী। স্ত্রীও পর্যাপ্ত সময় দেন না স্বামীকে। ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। একসময় এই সম্পর্কে তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

উচ্চ শিক্ষিতা গৃহিণী রিমি হক বলছিলেন, আগে পুরুষ বেশি শিক্ষিত ছিল, এখন নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে নারী তার মতামতের ওপর শ্রদ্ধাশীল হয়েছে। স্বামী বা পুরুষ ইচ্ছা করলেই তার সিদ্ধান্ত নারী বা স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। অবক্ষয় নয়, সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ফলে এটি হচ্ছে।

বিবাহ বিচ্ছেদ সামাজিক অবক্ষয় নাকি সমাজের পরিবর্তন এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। যদি পরিবর্তন হয়, তবে সেটা কী ধরনের পরিবর্তন।

এ বিষয়ে ঢাবি শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদকে আমরা সবসময় আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিচার করি। সবসময় এটা অবক্ষয় নয়, সামাজিক পরিবর্তনও হতে পারে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে উন্নত দেশের মতো যুবক যুবতীদের বিবাহ সম্পর্কে অরিয়েন্টেশন কোর্স বা প্রোগ্রাম করার পরামর্শ দেন তিনি। এটি শহরে আগে শুরু করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x