তারেক রহমানকে দেশে ফেরানোর সরকারি তৎপরতা নিয়ে ভাবছে না বিএনপি

Posted on by

ইউএনএন বিডি নিউজঃ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফেরানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের যে তৎপরতা চলছে তা জেনেও নির্ভার বিএনপি। দলটি মনে করে,সরকার তাকে ফিরিয়ে আনার যে কথা বলছে তার আইনগত ও বাস্তব ভিত্তি নেই। কারণ, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই। দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙতে নির্বাচনের আগে এ ধরনের বক্তব্য রাখছে সরকারি দল। তবে প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে যেতে রাজি বিএনপি। এজন্য প্রস্তুতিও রয়েছে দলটির ভেতরে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন,রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকার এসব বক্তব্য দিয়ে বিএনপির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায়।তবে নেতা-কর্মীরা সরকারের এসব চাল বুঝে গেছে অনেক আগেই। এগুলো বলে কোনও লাভ হবে না।

দলটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খোন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন,‘যুক্তরাজ্য মানবাধিকার ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।তাদেরকে গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলা হয়।সেই রাষ্ট্র থেকে তারেক রহমানকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বৈরশাসক শাসিত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।এছাড়াও মনে রাখতে হবে,বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনও বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই।সেক্ষেত্রে এটা অসম্ভব ব্যাপার।এটা আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফাঁকা বুলি।বিএনপির নেতাকর্মীদের নিরুৎসাহিত করার জন্য এটা বলা হচ্ছে।’

দলটির নেতারা মনে বলেন,লন্ডনে সফর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রবাসী বাংলাদেশিদের খুশি করতেই এই বক্তব্য দিয়েছেন।এ ধরনের বক্তব্য তিনি আগেও দিয়েছেন। তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত করায় তার ইমেজ ক্ষুণ্ণ করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম।

বিএনপির নেতারা বাস্তবতা তুলে ধরে বলছেন,বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।কিন্তু, গত ৮টি বছর নানা চেষ্টা তদবির করেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় বঙ্গবন্ধুর সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকলে যদি কাউকে বিদেশ থেকে আনা সম্ভব হতো তাহলে সরকার সবার আগে বঙ্গবন্ধুর যেসব খুনি তাদেরকে ফিরিয়ে আনতো।বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ক্ষেত্রে সরকার যেমনটি বার বার বলছে ‘ফিরিয়ে আনা হবে’, ঠিকই একই কায়দায় তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। বাস্তবতা হলো সরকার বিভিন্ন সময় তাদের ফিরিয়ে আনার কথা বলে রাজনীতির মাঠ গরম করলেও কার্যত তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি।

প্রসঙ্গত. গত ২১ এপ্রিল বিকালে লন্ডনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তারেক রহমানকে আমরা দেশে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হবো।এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তাকে ফেরত আনতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে।একদিন না একদিন দেশে ফিরে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে।’

গত ২২ এপ্রিল রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন,‘বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকলেও ‘মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাক্ট’ আলোকে কিছু অপরাধীকে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও আনা সম্ভব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব হোসেন বলেন,‘‘আইনমন্ত্রীর বক্তব্য যদি সঠিক হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুর যেসব খুনি বিভিন্ন দেশে আছে,তাদেরকে তো আনতে পারতো। কিন্তু তারা তো পারে নাই। কোনও সভ্য ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী দেশ যেখানে ‘স্বৈরশাসন’ চলছে সেখানে কোনও নেতাকে পাঠায় না। কারণ,তারা জানেন, ওই নেতাকে পাঠালে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার হবেন। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।’’

বিএনপির ভাইস চেয়ার‌ম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান  বলেন,‘প্রথমত, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বন্দি বিনিময় চুক্তি নেই। দ্বিতীয়ত হলো যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এ ‘স্বৈরাচার সরকার’-এর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক বিবেচনায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ কারণে, তারা কোনোভাবেই বন্দি বিনিময় চুক্তি ছাড়াই তারেক রহমানকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে না। কারণ, এখানে ন্যায়বিচার নেই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নেই। হয়তো রাজনৈতিক বিবেচনায় তারেক রহমানকেও জেলে পুরবে সরকার। তার জীবনেরও শঙ্কা আছে। তাই,এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী এর আগেও তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, মিথ্যা মামলার দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগের এখন প্রধান টার্গেট। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এমন কথা বলে দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙতে চান তারা। সরকার ভাবছে, নেতাকর্মীরা দুর্বল হলে রাজপথে সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে কষ্ট হবে। সেই সুযোগে বিএনপিকে চাপে রেখে আবার একতরফা নির্বাচন করে তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায় সরকার। এজন্য আগামী নির্বাচনের আগে তাকে ফিরিয়ে আনা হবে এ বক্তব্য মাঠে ছাড়ছে তারা। তবে দলের নেতাকর্মীরাও এতে বিচলিত নয়। তারা বোঝেন,এসব সরকারের রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালি বলেন, ‘সরকারের এসব বক্তব্য নিয়ে আমরা কোনও চিন্তা করি না। বিশ্বাস করি, তারেক রহমান অবশ্যই বাংলাদেশে আসবেন। তবে দেশে গণতন্ত্র কায়েম হওয়ার পরে। জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতা হিসেবে তিনি দেশে আসবেন। লাখ লাখ মানুষ তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।’

প্রসঙ্গত: ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। এরপর থেকে চিকিৎসার সুবিধার্থে তিনি সেন্ট্রাল লন্ডনের এডমন্টনে সপরিবারে বসবাস করছেন। সিঙ্গাপুরে অর্থপাচার মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তার করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকার একটি আদালত তারেক রহমানকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারের পরোয়ানা জারি করে।

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x