ত্যাগী ও অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা খালেদার

Posted on by

ইউএনএন বিডি নিউজঃ প্রতিমুহূর্তে গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যেও বিপুল সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতিতে দলের নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠান করে সরকারের প্রতি বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির একটি বার্তা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। নির্বাহী কমিটির উদ্বোধনী পর্বে সোয়া ঘণ্টা দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তবে রুদ্ধদ্বার সমাপনী পর্বে তার বক্তব্য ছিল মাত্র তিন মিনিটের। সংক্ষিপ্ততম এ বক্তব্যের মধ্যেই নেতাকর্মীদের জন্য রয়েছে সার্বিক নির্দেশনা। তিন মিনিটের এ বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ বক্তব্যের তাৎপর্য বিবেচনার কিছু দিক উল্লেখ করে সভায় অংশ নেয়া নেতারা বলছেন, সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বিএনপির এ সভা সরকারের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা।
কারণ প্রতিটি নেতাই সভায় অংশ নিয়েছেন গ্রেপ্তারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সপ্তাহ খানেক ধরেই রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে গ্রেপ্তার অভিযান ও বাসায় বাসায় তল্লাশি। শনিবার সকাল থেকেই সভার ভেন্যুর চারপাশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য অবস্থান নিয়েছিল। ভয়কে জয় করে সভায় অংশ নিয়েছে সাড়ে চারশ’র বেশি নেতা। এটা নিশ্চিতভাবেই খালেদা জিয়া নেতৃত্ব ও বিএনপির প্রতি রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার একটি বার্তা। নেতারা বলছেন, কাউন্সিলের দুই বছর পর এ সভায় নেতাদের অনেক ক্ষোভ-বিক্ষোভের কথা বলার ছিল। কিন্তু সবাই সবকিছু ভুলে খালেদা জিয়ার প্রতি ঐক্যের অঙ্গীকার প্রকাশ করেছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারের সম্ভাব্যসমূহ ষড়যন্ত্র মোকাবিলার আশ্বাস দিয়েছেন।
নির্বাহী কমিটির সভায় অংশ নেয়া নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া তিন মিনিটের বক্তব্যে রাজনৈতিক দুঃসময়ে নিজের শক্ত মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, ঐক্যের নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব ও দল পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার বক্তব্যে বিশ্বস্ততার পুরস্কার ও বিশ্বাসভঙ্গের পরিণামের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, আপনারা হঠকারী কোনো কিছুতে পা দেবেন না। দলকে বিপদে ফেলার মতো কিছু করবেন না। সবাই একতাবদ্ধ থাকবেন। এবার যদি কেউ দলের বিরুদ্ধে কিছু করে  তাদের চিহ্নিত করা হবে। যারা বেইমানি করবে, এক পা এদিকে, আরেক পা ওদিকে রাখবে, তাদের কোনো মূল্যায়নের জায়গা নেই। ক্ষমা কিন্তু একবার হয়, বারবার হয় না। আমার বিশ্বাস সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে শক্তিশালী করবেন। নিজে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত, নেতাদেরও প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, কী আর করবে? বড় জোর জেল দেবে। আমার হারানোর কিছুই নেই। রাজনীতির জন্য স্বামী, মা, সন্তান, এমনকি বাড়িও হারিয়েছি। আমার এক সন্তান বিদেশে। আপনারাই আমার আশা। আপনাদের নিয়েই আমি রাজনীতি করছি। আমি ভীতু নই। আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কেউ কিছু করতে পারবে না। আমি যেখানেই থাকি না কেন আপনাদের সঙ্গেই আছি। আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেছেন, সময় এসেছে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে চলবে। শান্তিপূর্ণভাবে কে কত কর্মসূচি পালন করতে পারেন তার ওপর দলে আপনাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। বিএনপি নেতাকর্মীদের আন্দোলনের ভিত্তি কী হবে তার একটি পরিষ্কার নির্দেশনাও রয়েছে খালেদার বক্তব্যের ছয় শর্তে। নতুন নেতৃত্বের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেছেন, এখন নতুনদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। দলটির নেতারা বলছেন, চেয়ারপারসনের এ বাক্যটির তাৎপর্য অনেক গভীর। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে তার অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনাকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য নেতাকর্মীদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারকে বার্তা দিয়েছেন ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে নেতৃত্ব শূন্য করা যাবে না। অবশ্য খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনায় নেতৃত্ব নির্বাচনে সতর্ক হতে চেয়ারপারসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তৃণমূল নেতারা। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, ৮ই ফেব্রুয়ারির রায়কে কেন্দ্র করে খালেদা জিয়া আইনি জটিলতায় পড়লে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় দল পরিচালনা করবে সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সাংগঠনিক টিম। রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, বিশ্বস্ত, ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতারাই থাকবেন সে টিমে। তবে ওয়ান ইলেভেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দুঃসময়ের জন্য দলের নেতৃত্ব ঠিক করার জন্য নির্বাহী কমিটির সভা থেকে খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন একাধিক নেতা। এদিকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভার পর জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন খালেদা জিয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাহী কমিটির সভায় তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য ও মতামতগুলো পর্যালোচনা, সে অনুযায়ী নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ও আন্দোলন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই এ বৈঠক ডাকা হয়েছে। ৮ই ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতি অনুযায়ী স্থায়ী কমিটিতে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো সামনে রেখে পদক্ষেপ নেবে বিএনপি।
নির্বাহী কমিটির সভায় রুদ্ধদ্বার পর্বে ব্যক্তিগত ক্ষোভ-বিক্ষোভের কথাগুলো নেতারা ভুলে থাকলেও কেন্দ্রের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়েছে তৃণমূল। তৃণমূল নেতাদের বেশিরভাগের বক্তব্যের সুর ছিল একই। প্রায় সবাই আগামী ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করেই নিজেদের মতামত ও বক্তব্য দিয়েছেন। তারা অঙ্গীকার করেছেন, খালেদা জিয়া জেলে গেলে তারা ঘরে বসে থাকবেন না। জেলা পর্যায়ের অনেকে বলেছেন, আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বর্তমান স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। নির্বাচনের আগে ওই রায় খালেদা জিয়ার বিপক্ষে গেলে বিএনপিকে কর্মসূচি দিতেই হবে। তৃণমূল নেতারা কেন্দ্রকে অভিযুক্ত ও সতর্ক করে বলেছেন, বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলো থেকে বারবার ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে সরে আসতে বাধ্য হওয়ার মূল কারণ কেন্দ্র তথা রাজধানীর নেতাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও নিষ্ক্রিয়তা। দলের বর্তমান অবস্থার জন্য অনেকাংশেই দায়ী কেন্দ্রীয় নেতারা। আগামী দিনের সম্ভাব্য আন্দোলন পরিচালনায় তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতাদের আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ঢাকা মহানগর বিএনপিকে রাস্তায় নামতে হবে। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় আন্দোলন করেও সফল না হওয়ার জন্য কেন্দ্র ও ঢাকা মহানগর নেতারাই দায়ী। আগামীতে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূল নেতারা খালেদা জিয়াকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই। তৃণমূল নেতারা সবসময় আপনার পাশে ছিল। আপনি যে নির্দেশ দেবেন আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সে নির্দেশ পালন করব। ঐক্যবদ্ধ থাকব। আপনার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে সরকার অন্যায় কোনো রায় দিলে শক্ত প্রতিবাদ করব।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, রায় নিয়ে উদ্বিগ্ন তৃণমূলের নেতারা কর্মসূচি চেয়েছেন। নেতৃত্বের শূন্যতা যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কমিটির সব সদস্যকেই দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেন তারা। তৃণমূলে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেয়ার জন্য কেন্দ্রের নির্দেশনার প্রয়োজন নেই বলেও তারা মত দেন। ওদিকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে লন্ডন থেকে বক্তব্য দিয়েছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনিও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা ও প্রতিবাদে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহমিনা রুশদীর লুনা বলেন, আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা পেয়েছি। সিলেট মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. শাহরিয়ারের মতে, চেয়ারপারসনের বক্তব্যেই পরিষ্কার, নেতৃত্বের জন্য এখন আর চেয়ে থাকা চলবে না। সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্যায় কোনো রায় দেয়া হলে তা রাজপথে মোকাবিলার অঙ্গীকার করে নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া আগামী নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মতামত দেন তৃণমূল নেতারা। তার সাজা হলে আমরা নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাহী কমিটির সবাই রাজপথে থাকব, অনশন করব। অবশ্যই আমাদের কর্মসূচি থাকবে। প্রয়োজনে রাজপথ থেকে জেলেও যাব। বুকের রক্ত দিয়ে তা প্রতিহত করব। যেটা করতে হবে, আমরা সেটাই করব। ঢাকার দিকে আমরা তাকিয়েও থাকতে চাই না। আর খালেদা জিয়াকে ছাড়া যারা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। এটা তাদের জীবনের জন্য হবে ঝুঁকিপূর্ণ।

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x