যুক্তিতর্কে আইনজীবী ‘মামলার ওজন বাড়ানোর জন্য খালেদা জিয়াকে জড়ানো হয়েছে’

Posted on by

ইউএনএন বিডি নিউজঃ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী আহসান উল্লাহ তাঁর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে বলেন, এ মামলায় সাক্ষীতে যা এসেছে তা দেখে মনে হয়েছে; এখানে মামলা করার মতো কোনো কিছুই নেই। বরং মামলা করতে হবে তাই করা হয়েছে। মামলার ওজন বাড়ানোর জন্য বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ আসামিদের জড়ানো হয়েছে।

আজ  বুধবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে ওই আইনজীবী এসব কথা বলেন।

আহসান উল্লাহ বলেন, কুয়েত থেকে টাকা আসার পর দুই ভাগ হলো। এক ভাগ কামাল সিদ্দিকী নিয়ে গেলেন ট্রাস্টের জন্য। আরেক ভাগ তারেক রহমানের কাছে এলো মঈনুল রোডের ঠিকানায়। মামলার তদন্তে বলা হলো, প্রথম ভাগ সুন্দরভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর দ্বিতীয় ভাগ সঠিকভাবে পরিচালনা হচ্ছে না। অথচ দ্বিতীয় ভাগের টাকাও ব্যাংকে রয়েছে। প্রাইভেট ট্রাস্টের এ টাকা দুই কোটির পরিবর্তে ৬ কোটিতে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে টাকাটা খরচও করা হলো না।তাহলে এই টাকা কী ক্ষতি হলো যে, মামলা করতে হবে। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কামাল সিদ্দিকীর নামে তো মামলা হলো না। তাহলে এখানে কেন মামলা হবে? অথচ মামলার কোনো গ্রাউন্ড নেই। পিপি (সরকারি কৌঁসুলি) সাহেব আসামিদের যাবজ্জীবন চেয়ে বসলেন। তিনিই চাইতে পারেন। কারণ আমরা যখন মুনাজাত করি তখন আল্লাহর কাছে অনেক কিছুই চাই। তখন কিন্তু ফেরেশতা এসে বাধা দেয় না। কিন্তু আল্লাহ যা খুশি মন চাইলে ন্যায়বিচার করে দিতে থাকেন।

আইনজীবী বলেন, “মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বললেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ষড়যন্ত্র করে টাকা খেয়েছেন। কিন্তু এখানে তো ষড়যন্ত্রের ‘ষ’ এর গন্ধ নেই। বরং ঘটনা হলো ১৯৯৩ সালের। আর মামলা হলো ওয়ান এলেভেনের সময়। হাসান মশহুদ চৌধুরীরা (দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য এসব কাজ করেছেন। তারা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য দুই নেত্রীকে কারাগারে পাঠালেন।”

আসামি শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী বলেন, ‘মাই লর্ড মানুষ অনেক আদর যত্ন করে পোষা কুকুর পালন করে। কিন্তু এই কুকুর যখন পাগল হয়ে যায় তখন এর মালিককে ও কামড় দেয়। এসব সরকারি কর্মকর্তাদের অবস্থা এমনই। মামলা করেছেন হাসান মশহুদ চৌধুরী। আর কেউ কেউ এসব মামলায় এসে পোড়া বাড়িতে আলু পোড়াচ্ছেন। এখানে আসামি শরাফুদ্দিন নিজের জায়গা বিক্রি করলেন। বিনিময়ে টাকা নিলেন। কিন্তু জায়গা যখন বায়না চুক্তির সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পরও রেজিস্ট্রি হলো না তখন আমরা টাকা ফেরৎ দিয়ে জায়গা নিয়ে নিলাম।’

যুক্তিতর্কে আরো বলা হয়, ‘আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। মূল অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। ফলে কোনো প্রশ্নই আসে না। রাজনৈতিক মামলায় দেখা যায়, ৪০ বছর ধরেই চলে। পরে দেখা যায় কিছু নেই। বরং আমার মক্কেল রং প্লেসে রং টাইমে থাকায় এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। কিছুদিন আগে মাগুরা এলাকায় দেখা যায়, দুই গ্রুপের সংর্ঘের সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন গর্ভবতী মা। তখন তিনিসহ তাঁর পেটের বাচ্চাও গুলিবিদ্ধ হয়। আসামি শরফুদ্দিনের বেলায়ও একই সমস্যা দেখা যায়।’

আইনজীবী আহসান বলেন, ‘রাজনীতি যদি রস চিবানোর মেশিনের মতো হয়, সেইরকম গ্রাইন্ডার হোক, তাতে দিলে রস বেরুবে। তাহলে তো  ভালো কোনো মানুষ রাজনীতি করতে আসবে না। মাই লর্ড, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যেভাবে মিথ্যা নথির ওপর মামলা সাজিয়েছেন এভাবে তো মামলা হয় না; ভুল মামলার সুযোগ আসামি পেয়েই থাকেন।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯৩ সালের ঘটনায় এখানে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অবৈধ কোনো লাভবানের কিছুই নেই। খালেদা জিয়ার দিকে আঙুল তোলা তো দূরে থাক, অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। তাই আমি বলব, আপনি ন্যায়বিচার করে আসামি সবাইকে খালাস দেবেন। এরপর মামলার কার্যক্রম আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মূলতবি করা হয়।’

আজ বুধবার বেলা ১১টা ১২ মিনিটে রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালত মামলার নতুন দিন ধার্য করেন।

এ মামলার অন্যতম আসামি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন তাঁর আইনজীবী আহসান উল্লাহ। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তাঁর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। যুক্তিতর্কে আসামি শরফুদ্দিনের খালাস চেয়ে প্রার্থনা করেন আইনজীবী।

এরপর মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামালের পক্ষেও আহসান উল্লাহ যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে আজ যুক্তি উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় বিকেল ৩টায় পরবর্তী যুক্তি উপস্থাপনের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন আদালত।

এর আগে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর দিনেও আদালতে হাজির হয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যদিও গতকাল মঙ্গলবার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ  বুধবারের জন্য তাঁকে আদালতের কার্যক্রম থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছিল।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দিতে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া। বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের এই আদালতে জিয়া অনফানেজ ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্কের শুনানি চলছে।

আজকের যুক্তিতর্কে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ নেই। কেননা, আজ এই মামলার অন্য আসামি কাজী সলিমুল হক ও শরফুদ্দিনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে শুনানিতে অনুপস্থিত থাকার আবেদন আদালত নাকচ করে দেওয়ায় মামলার কার্যক্রম চলাকালে প্রতিদিনই হাজির হতে হচ্ছে খালেদা জিয়াকে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন,গতকাল এই মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে আরাফাত রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজকের শুনানি মুলতবি রাখার আবেদন করা হয়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর না করে শুধু খালেদা জিয়াকে অব্যাহতি দেন। যেহেতু আবেদন অনুযায়ী শুনানি মুলতবি হয়নি সেহেতু আদালতে হাজিরা দিতে যথাসময়েই আসেন খালেদা জিয়া।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার নথি থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মামলায় খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x