দুদকের ধরাছোঁয়ার বাইরে ৪ ব্যাংকের সাবেক এমডি

Posted on by

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ জালিয়াতির জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, অগ্রণী এবং বেসরকারি এবি ব্যাংক। এসব জালিয়াতির ঘটনায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় আসামি করা হয় ব্যাংকগুলোর তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি)। এসব মামলায় অভিযুক্ত আরো অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও এখনো অধরাই থেকে গেছেন সাবেক চার এমডি।

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটে সোনালী ব্যাংকে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আত্মসাত্ করে হলমার্ক গ্রুপসহ পাঁচ প্রতিষ্ঠান, যা হলমার্ক কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত। হলমার্ক কেলেঙ্কারির অন্যতম অভিযুক্ত সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ন কবির। অভিযোগ রয়েছে, তারই পরামর্শে ও উদ্যোগে হলমার্ক গ্রুপ ব্যাংক থেকে বের করে নেয় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার (সাবেক হোটেল শেরাটন শাখা) তিন কর্মকর্তা সাবেক এই এমডির পরিকল্পনা কার্যকর করেন। পরে ঘটনাটি তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা চাইলে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা করে দুদক। পরে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আরো সাড়ে ৩৭২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হলমার্কসংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুদক ৩৮টি মামলা করেছে, যাতে আসামি করা হয়েছে মোট ৫১ জনকে। দুদকের মামলায় আসামির তালিকায় হলমার্ক গ্রুপসংশ্লিষ্টরা বাদেও বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। হলমার্ক জালিয়াতির ঘটনায় এখন পর্যন্ত একটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। রায়ে সোনালী ব্যাংকের সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপকসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত, এর মধ্যে দুজন গ্রেফতার থাকা অবস্থায় মারাও গেছেন। কিন্তু এখনো অধরা থেকে গেছেন ব্যাংকটির সাবেক এমডি হুমায়ন কবির।

২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ উঠলে তা অনুসন্ধানে নামে দুদক। প্রায় চার বছর অনুসন্ধান শেষে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় ২০১৫ সালে রাজধানীর তিনটি থানায় ১৫৬ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করা হয়। সব মামলায় আসামি হিসেবে আছেন ব্যাংটির সাবেক এমডি ফখরুল ইসলাম। ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে এরই মধ্যে ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীকে আটকও করেছে দুদক। তবে সাবেক এমডি রয়ে গেছেন অধরা।

সম্প্রতি দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল ইসলামের ওপর দায় চাপিয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু। সাবেক এ চেয়ারম্যানের দাবি, এমডির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই পরিচালনা পর্ষদ বিভিন্ন ঋণ অনুমোদন করেছে।

শতকোটি টাকার ওপর ঋণ নেয়া ১৫ প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গৃহনির্মাণ প্রকল্প ও ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এসব ঋণ ছাড়ে বড় ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেয় ব্যাংকটি। সীমার বাইরে গিয়েও অনুমোদন করা হয় ঋণ। ঋণের দায় পরিশোধে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে পুনঃতফসিলের সুযোগও দেয়া হয়। আবার বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে আগের ঋণ পরিশোধ না করা সত্ত্বেও নামমাত্র জামানত দিয়ে পুনরায় ঋণ দেয়া হয়। তবে ঋণের অর্থ ফেরত আনতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত তা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আর তাতে দীর্ঘমেয়াদে আটকে গেছে ব্যাংকের অর্থ।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির ৭৯২ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এ অভিযোগে গত বছরের ৩০ জুন তাকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তানাকা ট্রেডকম ইন্টারন্যাশনাল, মুহিব স্টিল, মাহিদ অ্যাপারেল, মুন গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানিকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ঋণ প্রদান, নবায়নসহ নানা অভিযোগ উঠেছে সৈয়দ আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে।

মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুন গ্রুপকে ১০৮ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করে অগ্রণী ব্যাংক। পরবর্তীতে মুন গ্রুপ পর্যায়ক্রমে ৯৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা উত্তোলন করে তা আত্মসাত্ করে। দুদকের অনুসন্ধানে অবৈধভাবে ঋণ প্রদানের প্রমাণসাপেক্ষে গত বছরের ৩০ জুন রাজধানীর মতিঝিল থানায় আটজনকে আসামি করে মামলা করেন কমিশনের উপপরিচালক বেনজির আহমেদ। এ মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আব্দুল হামিদকেও আসামি করা হয়। কিন্তু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন তিনি।

এবি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির তিন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ২৮ জুন মামলা করে দুদক। সিটিসেলের নামে এবি ব্যাংক থেকে এ অর্থ আত্মসাত্ করা হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়। সিটিসেলের নামে আটটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অনিয়মের মাধ্যমে ৩৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাত্ করেছেন আসামিরা। ২০১১-এর ২১ মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এ অর্থ আত্মসাত্ করা হয়। মোরশেদ খানের স্ত্রী নাসরিন খান ছাড়াও সিটিসেলের ভাইস চেয়ারম্যান আসগর চৌধুরী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহবুব চৌধুরী, এবি ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক) মসিউর রহমান চৌধুরী ও ব্যাংকটির সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার আহমেদ চৌধুরী ও এম ফজলুর রহমানকেও মামলায় আসামি করা হয়। মেহবুব চৌধুরী গ্রেফতার হয়ে পরে জামিন পান। অন্যদের গ্রেফতারে কোনো দৃশ্যমান তত্পরতা দেখা যায়নি।

এসব বিষয় যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিচ্ছুক দুদকের মহাপরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তাদের গ্রেফতার করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মামলার স্বার্থে তাদের এখন গ্রেফতার করা না হয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঠিকই গ্রেফতার করা হবে।

More News from ভ্রমণ

More News

Developed by: TechLoge

x