মুক্তিযুদ্ধের গল্প মৃত্যু যেভাবে বাঁচায়

Posted on by

সরাসরি এ গল্পে ঢুকে পড়তে হলে স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথন অংশ থেকে শুরু করাটাই আপনাদের জন্য সুবিধাজনক। দীর্ঘ ও স্বচ্ছন্দ দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে হঠাৎ তৈরি হওয়া টানাপোড়েন আপনাকে মূল ঘটনার দিকে নিয়ে যাবে। আমি নিজে অনুপস্থিত থেকে সেই পরিস্থিতির একটা ছবি যে তুলে ধরছি সেটা বিশ্বাস করতে হবে আপনাকে। কেননা এটা আমার পরিবারের, এমনকি শেষ পর্যন্ত আমারই গল্প।

১.

বিস্মিত আরিফা তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? যে কথা কোনো দিন বলি নাই, আজ এতকাল পর এসব ছেলেটাকে বলার দরকার পড়ল কেন?’

‘বলতে হবে, আজ বলার সময় হয়েছে।’ শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল মোমিনুল, ‘আরও কিছু কথা বলব, যা তুমিও জানো না।’

আরিফার বিস্ময় বিস্তৃত হলো। চিরকাল দেখে এসেছে কথা বলার সময় বাক্য শেষ করার আগেই লোকটার গলার স্বর কেঁপে যায় বা অস্পষ্ট হয়ে আসে। এই নড়বড়ে ব্যাপারটা নিয়ে স্বামীর ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত আরিফা। সংসার সামলানোর যেমন, পরিবারের যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বও তাই নিজের কাঁধে নিতে হয়েছে। অনেকটা মাতৃতান্ত্রিক পরিবার। এ ব্যাপারে স্বামীর ওপর রাগ-ক্ষোভ যেমন আছে, আবার অবাধ সমর্থন পেয়ে কৃতজ্ঞতার বোধও আছে। কিন্তু আজ আরিফার বিস্ময় ও অনুক্ত অনিচ্ছাকে উপেক্ষা করে লোকটা যে ব্যাপারটাকে সামনে নিয়ে এল, তা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে সেই সময়টাতেই যখন পুরো পরিবারটাই বিপর্যস্ত। দীর্ঘকাল সযত্নে গোপন করে রাখা ঘটনা অবতারণা করে সংসারটাকে আরেক দফা ঝড়ের মুখে ফেলার কী এমন প্রয়োজন পড়ল বুদ্ধিতে কুলোয় না আরিফার।

‘আজ বলা দরকার, এখনই বলা দরকার।’ মোমিনুল বলল। কী আশ্চর্য তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

এই দম্পতির ছোট ছেলে রাকিব একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিউতে জীবন-মরণের মাঝামাঝি ঝুলে আছে। ‘মাঝামাঝি’ বলাটা রেওয়াজ, বাস্তবে ঝুঁকে আছে মৃত্যুর দিকেই। আট দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আরিফা ও মোমিনুল ধীরে ধীরে বুঝতে বা মেনে নিতেও শুরু করেছে তার ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণতর হচ্ছে। মায়ের বুক ভেঙে যায়, ১৬-১৭ বছরের তাগড়া ছেলেটা এভাবে চলে যাবে! অথচ এ সংসারে আরিফারই শক্ত থাকার নিয়ম। আগে-পরে সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি তাকে নিতে হবে, এমনই দুর্ভাগ্য!

তবে মোমিনুলকে নিয়ে ভয় ছিল যতটা, সে রকম হয়নি। শুরুর দিকে উদ্‌ভ্রান্তের মতো হাসপাতালের দরজায় পায়চারি করত। এখন অনেকটাই সামলে নিয়েছে। শুধু সামলে নিয়েছে বললে যথার্থ হয় না, কী করে যেন যেকোনো পরিস্থিতির সামনে দাঁড়ানোর শক্তিও সঞ্চয় করেছে।

ছেলের বিপদটা তো আরিফা আঁচ করতে পারছিল আগে থেকেই। নিজে বারবার তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এসব রাজনীতি-ফাজনীতিতে না জড়াতে। কিন্তু চোখের সামনে ছেলের এই বেপরোয়া আচরণকে কখনো বাধা তো দেয়ইনি, বরং এক ধরনের অনুমোদনই ছিল যেন মোমিনুলের। ছেলেটাও তাই মুখের ওপর বলত, ‘আম্মা আমি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে, লাঠি-গুলিকে ভয় পাওয়া আমার রক্তে নাই।’

খেঁকিয়ে উঠত আরিফা, ‘হ্যাহ্, মুক্তিযোদ্ধার ছেলে। দেশ স্বাধীন হয়ে কত-না উপকার হইছে আমাদের, যেই লাউ সেই কদুই তো আছি।’

‘কী মনে করছিলা তুমি, দেশ স্বাধীন অইলে একতলা বাড়ি সাততলা হয়ে যাবে? আমার আব্বা সাততলা বাড়ি আর প্রতিদিন পোলাও-কোর্মা খাওয়ার জন্য যুদ্ধ করছিল?’

বাপটা যত মেনিমুখো, ছেলে যেন ততটাই ব্যঘ্রশাবক, কথা বলে পার পাওয়া যায় না। কিন্তু কথার তোড়ে তো সেদিন মাকে চুপ করিয়ে দিছিস বাবা, আজ তোর জবান বন্ধ, হয়তো আর কোনো দিনই…মায়ের বুক ভেঙে যায়! বিলাপ করে যে একটু কাঁদবে সে উপায়ও নেই। কারণ এটা তো মাতৃতান্ত্রিক পরিবারই, আরিফার দুর্বল হলে চলে না।

মোমিনুল মুক্তিযোদ্ধা। ঘরের দেয়ালে বাঁধাই করা মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র আর নানা প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া সম্মাননা স্মারকগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আরিফা মাঝে মাঝেই ভাবে এই দুর্বলচিত্তের মানুষটা কী করে ট্রেনিং নিয়েছিল, অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হাতে! আবার ভাবে সেই সময়টা তো এ রকমই ছিল, কত নিস্পৃহ চোখেও আগুন জ্বলতে দেখেছে তখন।

কিন্তু আজ এত দিন পর এই সময়টাতে, ছোট ছেলের জীবন আর মৃত্যু যখন একটি সুতোর ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে, তখন বড় ছেলেটাকেও কেন দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত একটি সত্যের মুখোমুখি করতে হবে এই বিস্মিত প্রশ্নের কোনো যুক্তিসংগত উত্তর খুঁজে পায় না আরিফা বেগম। তা ছাড়া এই সত্য-মিথ্যার ব্যবধানটিও একটি সরু সুতোর চেয়ে বেশি দূরত্বের নয় বলে মনে হয় তার। অথচ এর প্রতিক্রিয়া অনেক বড়। কত বড় হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা করার মতো সাহস বা সামর্থ্যও নেই আরিফার। কিন্তু মোমিনুলের মতো দুর্বলচিত্তের মানুষটা, অসংগঠিত বাক্যে কথা বলার লোকটা আজ হঠাৎ করে এতটা মনোবল সংগ্রহ করল কী করে!

আরিফা আরও একবার চেষ্টা করল স্বামীকে নিবৃত্ত করতে, ‘দেখ আসিফকে এসব কথা বলাটা ঠিক হবে? দিনের পর দিন ছোট ভাইটার জন্য হাসপাতালে রাত কাটাচ্ছে সে। এখন সে যদি জানতে পারে…।’

কিন্তু মোমিনুল অনড়, ‘তার জানা দরকার, এখনই জানা দরকার, এটাই আসল সময়।’

আরিফা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় স্বামীর দিকে।

২.

আমার ভাই রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়েছে রাজপথের মিছিলে। স্বৈরশাসক এরশাদের বাহিনী পুরো দেশটাকে ট্যাংকের নিচে পিষ্ট করে যতই শান্তি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, ততটাই ফুঁসে উঠেছে মানুষ। মিছিলের ওপর ট্রাক চাপিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে দুজন তরুণকে। নূর হোসেন নামের এক আশ্চর্য যুবক উদোম বুকে পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাস্তায় নেমেছিলেন, এরশাদের সেনারা গুলি করে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে তাঁর বুক। খুন হয়ে গেছেন ডা. মিলনের মতো সম্ভাবনাময় আরেক যুবক। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুই ভীতির বদলে নতুন করে সাহস সঞ্চার করছে যেন। ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলিতে নিহত হয়েছেন জয়নাল, দীপালি সাহাসহ আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রী। এ খবর পৌঁছাতেই চট্টগ্রামে এর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠা ছাত্রদের মিছিলে গুলি করে হত্যা করা হলো মোজ্জাম্মেলকে। গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমবেত হচ্ছে মানুষ। তরুণ ও ছাত্রসমাজ তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, এ যেন তাদের কাছে নতুন এক মুক্তিযুদ্ধ।

আমার ভাইটিকে কদিন ধরেই দেখছিলাম অন্য রকম এক বদল ঘটে যাচ্ছে তার ভেতর। কলেজে ছাত্রসংগঠনের কর্মী ছিল, সে রকম কলেজজীবনে অনেকেই তো থাকে, এ অনেকটা সবার সঙ্গে দলেবলে থাকার মতো। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে দেখছিলাম কী রকম উত্তেজনায় টান টান হয়ে আছে। সকালে বেরিয়ে যেত, বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে। বয়সে তিন বছরের ব্যবধান আমাদের। আমরা দুই ভাই এক বিছানায় ঘুমাই। বাড়ি ফিরে এলে ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাই অনেক কথা হতো দু-ভাইয়ের। সারা দিনের জমানো কথাগুলো বলার জন্য আমার মতো এত কাছে তো কেউ ছিল না। এমনকি শায়লা নামের ক্লাসমেট এক মেয়ের সঙ্গে যে তার সম্পর্কটা প্রেমের মতো কিছু একটা হতে যাচ্ছে এসব কথাও, কিছুটা দোনোমনা করে শেষ পর্যন্ত বলে ফেলত আমাকেই। কিন্তু কিছুদিন কথাবার্তা প্রায় বন্ধ। ঘরে ফিরে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে সোজা এসে শুয়ে পড়ে। কখনো ঘুমিয়ে পড়ত, কখনো নির্ঘুম ছটফট করছে তা-ও টের পেতাম। ক্রমশ বেপরোয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বুঝতে পারছি। মা-বাবার সঙ্গে এ নিয়ে বেশি কিছু বলারও ছিল না, তারাও তো দেখছে। একদিন নিজেই ডেকে বলেছিলাম, ‘আজকাল লেখাপড়া একেবারে ছেড়ে দিয়েছিস মনে হচ্ছে।’

কোথাও বেরোচ্ছিল তখন, শার্টটা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে বেশ দৃঢ় গলায় সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল, ‘এখন ঘরে বসে বই মুখস্থ করার সময় না।’

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। একটু দ্বিধাগ্রস্তও হয়ে পড়েছিলাম, রাকিব কি আজকাল আমাকে স্বার্থপরও ভাবছে? দেশের এমন এক উত্তাল অবস্থার মধ্যে আমার মতো একটা যুবক, যার এখন মিছিলে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়, সে কী করে চোখ-কান বুঁজে সুবোধ ছাত্রের মতো এমন নিরাপদ জীবন কাটাতে পারছে! এর মাত্র দুদিন পরেই গুলিবিদ্ধ হয়েছে রাকিব। লালদিঘির ময়দানে শেখ হাসিনার জনসভায় যোগ দিতে গিয়েছিল মিছিল নিয়ে। সভা শেষ হওয়ার পরপরই হঠাৎ বিনা উসকানিতে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করেছিল পুলিশ। শেখ হাসিনাই হয়তো টার্গেট ছিলেন। কিন্তু আইনজীবীরা দ্রুত তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন পাশেই পাহাড়ের ওপর কোর্ট বিল্ডিংয়ে। কালো রাস্তার পিচ রক্তে লাল। স্বপন চৌধুরী, শামীম, বদরুল, এথেলবাট গোমেজ, হাসান…কত তরুণ যে ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে গিয়েছিল পথের ওপরই। কত লাশ তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। ধর্ম-সম্প্রদায়নির্বিশেষে লাশ পোড়ানো হয়েছে বলুয়ার দিঘির শ্মশানে। এত লাশ একসঙ্গে আর কখনো দেখেনি কালু ডোম। কয়েক বোতল চোলাই গিলেও সেদিন আর নেশা হয়নি তার।

বন্ধুরা ধরাধরি করে একটা বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল রাকিবকে। হাসপাতালের লোকজন থানা-পুলিশের ভয়ে আহত রোগী ভর্তি করতে রাজি হচ্ছিল না কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত কীভাবে যেন ব্যবস্থা করেছিল রাকিবের বন্ধুরা।

খবর পেয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়েছিলাম আমরা। ডুকরে কেঁদে উঠেছিল আমার মা, কিন্তু হাসপাতালের লোকজন সতর্ক করে দেওয়ার পর নিজেকে সংবরণ করে কাটা মাছের মতো ছটফট করছিল। আব্বাকে দেখি নির্বিকার, শুধু ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকাই যেন তার ভূমিকা। এই মানুষটা আমার ভেতর হাহাকার জাগিয়ে দেয়। সেই থেকে হাসপাতালের করিডরে বেঞ্চে ঘুমিয়ে না ঘুমিয়ে রাত কাটাই আমি। ডাক্তাররা কোনো আশ্বাস দেন না, আমি তাঁদের মুখ থেকে যেকোনো মুহূর্তে রাকিবের মৃত্যুর ঘোষণা শোনার অপেক্ষা করি।

৩.

এবার সরাসরি গল্পটাতে ঢুকছি আমি। মানে আমাকে টেনে আনা হয়েছে। কিচেনের সঙ্গে লাগোয়া খাবার টেবিলটাকে ঘিরে বসেছি আমরা তিনজন। কিছু কথা গুছিয়ে বলবে বলে অনেক প্রস্তুতি নিয়ে আমার আব্বা মোমিনুল হক আমাকে ডেকেছে। কথাগুলো সহজে বলা যায় না। বলার আগে মুখ থেকে থুতনি পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপছে তার। আমার মায়ের চেহারা বিবর্ণ।

আমার দিকে তাকিয়ে একবার ঢোক গিলে আব্বা বলল, ‘বাবারে আমি তোর জন্মদাতা বাপ না, তোকে এ কথা কখনো…।’

এটুকু বলতে পেরে একটি নাটকীয় মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। কালো মেঘ দুফালি করে দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করছিল। একটা প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দের জন্য কি উৎকর্ণ হয়ে ছিল এই দম্পতি?

আমি নির্বিকার কণ্ঠে বললাম, ‘আমি জানি। তবু তুমিই আমার আব্বা।’

‘তুই জানিস!’ প্রায় চিৎকার করে উঠল মোমিনুল। কয়েক মুহূর্ত ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে উঠে জড়িয়ে ধরল আমাকে, ‘তুই জানিস? তুই জানিস?’ বলে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। গুলিবিদ্ধ ছোট ছেলেটাকে দেখে একবারও কাঁদতে দেখিনি মানুষটাকে, এখন আমাকে জাপটে ধরে শিশুর মতো কাঁদছে। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফোঁপাচ্ছেন আমার মা-ও।

এই মানুষ দুটির সারল্য ও নির্বুদ্ধিতা দেখে বিস্মিত হই আমি। মুক্তিযুদ্ধের বছর দেড়েক আগে আমার জন্ম। যুদ্ধে আমার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আমার মাকে বিয়ে করেছিল এই মোমিনুল হক, বাবার সহযোদ্ধা। ফটিকছড়ির গ্রাম থেকে একটি শিশুপুত্রসহ পিতৃহীন দরিদ্র পরিবারের আরিফা বেগমকে শহরে এনে সংসার পেতে মনে করেছিল যাবতীয় অতীত মুছে দিয়ে এসেছে। কিন্তু এ কথা ভুলে গেল, আমার জন্ম-পরিচয় আমাকেই জানিয়ে যাওয়ার ‘দায়িত্ব’ আত্মীয়স্বজন বা শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ না কেউ পালন করবেই। তারা সেটা করেছে। এই বয়স পর্যন্ত অন্তত সাতজনের কাছে এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জেনেছি।

আমি আব্বাকে দু-হাতে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমি জানি, সব জানি।’

কী আশ্চর্য, দুজনই ভিখিরির মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। প্রবল স্রোতের টানে জলে তলিয়ে যেতে থাকা মোমিনুল হক দুহাত ওপারে তুলে ধরে আশ্রয় খুঁজছে। আমি টেনে তুললাম কূলে, ‘তোমার বন্ধুর কথা কি আমার মনে আছে? আমি চিনি তোমাকে। তুমিই আমার আব্বা। কোনো অনাদর তো কর নাই কোনো দিন। তোমার ছেলে না এ কথা তো বুঝতে দাও নাই।’ নিজেকে সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, আমারও গলা ধরে আসে।

গল্পটা এখানে শেষ হতে পারত। আনন্দ-বিষাদ কিংবা শোক-সন্তাপের পর নতুন একটা মিলনের গল্প হয়ে উঠত। কিন্তু মোমিনুল হক শেষ হতে দিল না। বলল, ‘আরও কিছু কথা আছে আমার।’

সবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে আমার মা, এবার কঁকিয়ে উঠল, ‘আবার? আরও কথা আছে তোমার?’

‘হ্যাঁ, আছে, এসব কথা তুমিও জানো না। এই যে মুক্তিযোদ্ধার সনদটা ঝুলিয়ে রেখেছি ঘরের দেয়ালে, এতগুলো পদক-ফদক সাজিয়ে রাখা হয়েছে এগুলো গলার কাঁটা হয়ে ছিল আমার, এই গ্লানির বোঝা আর বইতে পারছিলাম না আমি।’

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই, সম্ভবত এপ্রিল মাসে রাঙ্গুনিয়া থেকে পাহাড়ি পথে রামগড়ে গিয়ে পৌঁছেছিল মোমিনুল। সাহসে কুলোচ্ছিল না। বন্ধু ইকবালই পিঠে চাপড় দিয়ে বলেছিল, ‘এখন না হলে আর কখন? পাকিস্তানিদের বন্দুকের ভয়ে লুকিয়ে-পালিয়ে মরার মতো বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যিকারের মরাটা অনেক ভালো।’

ঘরে তরুণী বউ আর শিশু-সন্তানকে ফেলে ইকবাল যেতে পারছে, মোমিনুলই-বা না করে কীভাবে। বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল। রামগড়ে গিয়ে দেখা হয়েছিল তখনকার নামকরা ছাত্রনেতা এস এম ইউসুফের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছিলেন সীমান্তের ওপারে সাব্রুম বিএসএফের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং চলছে। পথের দিশা পেয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল ইকবালের মুখ। মোমিনুলের বলার কিছু ছিল না। ফেনী নদী পার হয়ে সাব্রুম পৌঁছে গিয়েছিল দুই বন্ধু। সাব্রুমে এক সপ্তাহের একটা ট্রেনিং হলো। কিন্তু সাহস তো আসলে অস্ত্রে থাকে না, থাকে মনে। সেই মনের জোরটাই কোনো দিন শরীরে জড়ো করতে পারেনি মোমিনুল। ট্রেনিং শেষে সাতজনকে বাছাই করা হয়েছিল। বাছাই দলে ইকবালের জায়গা হয়েছিল, বাদ পড়ে গিয়েছিল মোমিনুল। ইকবালদের সাতজনকে এরপর পাঠানো হয়েছিল হরিনা ক্যাম্পে। সেখান থেকে মিজোরাম লোয়ার হাফ লং ক্যাম্পেও ট্রেনিং নিয়েছিল তারা। এদিকে কিছুদিন এখানে-ওখানে কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত আবার বহু কষ্টে চট্টগ্রাম ফিরে এসেছিল মোমিনুল। বলা যায় পালিয়েই এসেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তখন নানান জায়গায় অপারেশন চালাচ্ছে। আনোয়ারা থানায় অপারেশন করে অস্ত্র লুট করার ঘটনা, নিউমার্কেটের মোড়ে পাকিস্তানি আর্মির জিপে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা রফিকের মৃত্যুর ঘটনা—এসব খবর কানে আসছে তখন। শহরে আটকা পড়া নিরীহ বাসিন্দাদের মতো এসব খবর শুনে ভয়ে-আতঙ্কে বুক হিম হয়ে যেত। ঘাটফরহাদবেগের সপরিবারে পালিয়ে যাওয়া এক হিন্দুবাড়িতে থাকার জায়গা হয়েছিল। গোপনে বিবিসির খবর শুনত, আর আজাদী পত্রিকায় ‘দুষ্কৃতকারীদে’র হামলা ও হতাহতের বিবরণ পড়ে আরও কুঁকড়ে যেত ভয়ে।

এই সময়টাতে, তখন নভেম্বর মাস। একদিন ইকবালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আন্দরকিল্লার মোড়ে। দেখেই বন্ধুকে জড়িয়ে ধরেছিল ইকবাল। অন্য এক ইকবালকে দেখেছিল সেদিন। একটা লুঙ্গি আর সাদা শার্ট পরা সাধারণ দশজনের মতো চেহারা। কিন্তু চোখেমুখে টগবগ করে ফুটছিল। একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে মাত্র আগের দিনই তাদের এক সফল অপারেশনের বিবরণ শুনিয়েছিল ইকবাল। চন্দনপুরার জয়নগর এলাকায় রাজাকারদের একটি ঘাঁটিতে কীভাবে হামলা চালিয়ে সাত-আটজনকে লুটিয়ে দিয়ে এসেছে সেই বিবরণ শুনে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল মোমিনুলের। বন্ধুর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্বলচিত্তকে সেদিন আরও একবার যেন শনাক্ত করেছিল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিল বোধ হয় ইকবাল নিজেই। আপাতত সে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে, নজির আহমদ চৌধুরী রোডের সেই আস্তানাটাও তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল।

‘এই ভুলটা না করলে তোর বাবা, আরিফার স্বামী ইকবাল হয়তো বেঁচে থাকত…।’ বলে মাথা নামিয়ে নিল মোমিনুল।

ব্যথা ও বিস্ময়ে ভেঙেচুরে যাওয়া কণ্ঠে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল আরিফা, ‘তুমি…তুমিই…?’

‘হ্যাঁ, আমি। আমিই আলশামস বাহিনীর লোকজনকে ওর ঠিকানাটা জানিয়ে দিয়েছিলাম।’

পাকিস্তানি আর্মি, রাজাকার ও অন্যান্য দেশীয় দালাল গোষ্ঠী তখন পাগল হয়ে উঠেছে। ধরপাকড় চলছে সর্বত্র। এর মধ্যেই একদিন দেওয়ানবাজার এলাকা থেকে মোমিনুলকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল আলশামস বাহিনী, মীর কাসেম আলীর লোকেরা। কাটাপাহাড় লেনের মহামায়া ডালিম হোটেলের টর্চার ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে প্রথম দিনই হাত-পা বেঁধে এমনভাবে পিটিয়েছিল গরগর করে ইকবালের মুখে শোনা অপারেশনের কথা, তার এখনকার ঠিকানা সবকিছুই জানিয়ে দিয়েছিল মোমিনুল।

‘আমি মুক্তিযোদ্ধা না, আমি মুক্তিযোদ্ধা না…আমি একটা কাওয়ার্ড, আমি নিজে বাঁচার জন্য বন্ধুকে…।’ বলে ফুঁপিয়ে উঠল মোমিনুল।

আমরা দুজন নির্বাক তাকিয়ে আছি তার দিকে।

হঠাৎ মুখ তুলে আমাকে বলল, ‘রাকিব গুলি খেয়ে এই বয়সে আমাকে কত বড় সম্মান দিয়েছে ভাবতে পারিস বাবা? ওর বদলে তোর যদি কিছু হতো, তাহলে আরও একবার ইকবালের কাছে হেরে যেতাম আমি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আমি পারি নাই, আমার ছেলে, যার শরীরে আমার রক্ত সে তো পারল…যুদ্ধে যাওয়ার সাহস সে তো দেখাতে পারল…।’

এখন চেহারায় একটা দীপ্ত ভাব ফুটেছে মোমিনুলের, আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, ‘রাকিবের বদলে তোর বুকে যদি গুলিটা লাগত…তাহলে তোর বাবার সেই তেজী মুখটাই তো মনে পড়ত আমার। সেই মুখটা মনে পড়লে আমার নিজেকে একটা কেঁচো মনে হয়। সারা জীবন একটা মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ালাম। আমার ছেলেটা মরতে মরতে কীভাবে আমাকে বাঁচিয়ে দিল ভাবতে পারিস?’

আমি তাকিয়ে আছি মোমিনুলের দিকে। তার প্রতি কি করুণা বোধ করছি আমি? নাকি নিজের প্রতিও?

Developed by: TechLoge

x