বাকশালী মানসিকতায় আওয়ামী লীগ

Posted on by

রহমত উল্লাহ শিপন ::: ৪০ বছর পর এখনও আওয়ামী লীগ বাকশালী মানসিকতায় একা অর্থাৎ এক দল ( আওয়ামী লীগ ) ছাড়া আর যাতে কেউ বাংলাদেশ শাসন করতে না পারে, এই ধ্যান-ধারনা ত্যাগ করতে পারছেনা। এখন ১৯৭২-৭৫ সময়ের মত সব দল বিলুপ্ত করে একদল বাকশাল করা হয়ত সম্ভব নয়, কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগের অগতান্ত্রিক চরিত্রের পরিবর্তন হবে এটাও আশা করা সম্ভবত বোকামী। আওয়ামী লীগ এখন বিশেষ করে ৫ জানুয়ারীর বিতর্কিত, অগনতান্ত্রিক ও একতরফা নির্বাচনের পর গায়ের জোরে ( রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার করে ) দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে, তথা স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসন করতে প্রধান বিরোধিতাকারী ও আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপিকে আওয়ামী লীগের ভাষায় রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে ধ্বংস বা নি:শেষ করে দেওয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর বলেই দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসেই শেখ হাসিনা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নাম থেকে জিয়া শব্দটা মুছে দিল। এরপর খালেদা জিয়াকে অবৈধ দখলদারের মত তার ৪০ বছরের স্মৃতিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হল। পরবর্তিতে সংসদ সংলগ্ন শেরে বাংলানগর থেকে জিয়ার কবর গুড়িয়ে দেওয়ার পটভূমি তৈরী করার চেষ্টা শুরু করেছিল; আর এ লক্ষ্য শেখ হাসিনার মাথায় হয়তো এখনও আছে। দুই সতিনের যে গল্প আমাদের দেশে আছে, শেখ হাসিনা মনে হয় খালেদা জিয়াকে তার প্রতিপক্ষ না ভেবে সতিন ভাবে। তাই ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত সংসদের ভেতরে, দেশের ভেতরে, এমনকি দেশের বাইরে গেলেও যে কোন অনুষ্ঠানে প্রথমে খালেদা জিয়া, অথবা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া ও তার ছেলেদের বিরুদ্ধে বিষোদগার, কটুক্তি, কুরুচিপূর্ন মন্তব্য করেই যাচ্ছে; এটা যেন তার রুটিন কাজ।

গনতন্ত্রে বিশ্বাসী নয় বা গনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই বলেই শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরিবর্তে “কৌশলে” বিএনপিকে নি:শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের মতে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নিলেও জনগনের কাছে বিএনপি’র যে গ্রহনযোগ্যতা আছে, এ বাস্তবতা তারা মানতে চায়না। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের পর ৭৫ – ৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর পার করেও বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দলের দাবীদার আওয়ামী লীগ ১৯৯১ এর নির্বাচনে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া দল বিএনপি’র কাছেই পরাজিত হয়েছিল। জনগনের ভোট বা সমর্থন পেয়েই বিএনপি দুইবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়েছিল; কোন সামরিক শক্তির পৃষ্টপোষকতায় নয়। শেখ হাসিনা, তার দল আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রী ও তাদের দোসর সমর্থক গোষ্টি রাতদিন সরকারের উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলার পরেও ২০১৩ সালের জুন-জুলাইতে অনুষ্ঠিত গাজিপুরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ন ৫টা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের কাছেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল। ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারীর কথিত নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ভাল ফলাফল করেছিল। বিএনপি’র জনভিত্তি, জনসম্পৃক্ততা বা জনসমর্থন ছিল বা আছে বলেই তাতে প্রমানিত হয়েছে।

এরূপ, বিশাল জনগনের সমর্থন যে দলটার প্রতি রয়েছে তাদেরকে বাদ দিয়ে বা তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে মাত্র ৫-১০% লোকের মেন্ডেট নিয়ে গায়ের জোরে ক্ষমতা ৫ বছর ( বা অরো বেশী সময় ) ধরে রাখার কথিত কৌশল বা প্রচেষ্টা কখনও গনতান্ত্রিক নয়। বিএনপিকে এখন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করা, বিএনপি জোটের শরীকদের বিভিন্ন টোপ দিয়ে ২০-দলীয় জোটকে ভেঙ্গে দেওয়ার ফন্দি করা, বিএনপি’র শীর্ষ নেত্রী ও এর সিনিয়ার নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে বিএনপিকে নেতৃত্ব শূন্য করা, বিএনপি নেত্রীসহ অন্যান্যদের গৃহবন্দী করে রাখা – এ সবই আওয়ামী লীগের ১৯৭২-৭৫ সময়ের বাকশালী মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ স্বৈরাচারী ও অগনতান্ত্রিক চরিত্রের নবতর রূপ।

আওয়ামী লীগ যে শুধু একটা অগনতান্ত্রিক দল তাই নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ লাজ-শরম বা দলের কথিত আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তাদের একসময়ের ভয়ানক দুশমন ( ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত হাসানুল হক ইনুর জাসদসহ বিভিন্ন বামপন্থি দল যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ বা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল, শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানানোর শ্লোগান দিত), সামরিক স্বৈরাচার, উগ্র মৌলবাদী দল বা গোষ্টি এমনকি তাদের ভাষায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধী আপরাধীদের সাথেও জোট বাঁধতে, হাত মেলাতে, সমঝোতা করতে বা নৌকা মার্কার আবরণ দিয়ে কোলে তুলে নিতে অতীতেও দেখা গেছে এবং এখনও দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য যাকে বঙ্গবীর উপাধি দেওয়া হয়েছিল, শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন অপকর্মের সমালোচনা করায় তাকেও আওয়ামী লীগ রাজাকার বলতে দ্বিধা করেনি। এসব বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগের নির্লজ্জ ও দ্বৈত চরিত্রের সাথে আজ ভালভাবেই পরিচিত।

বিএনপি’র শাসনামলে ১৯৯৬ সালের মাগুড়া উপ-নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতার (প্রশাসন, আইণ শৃংখলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের সার্বিক শাসন ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করে নির্বাচনের উপর সরকারী দলের হস্তক্ষেপ বা প্রভাব থাকে বলে) কারণে বাংলাদেশে কোন ক্ষমতাসীন (দলীয়) সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ ( সরকার পরিবর্তনের ) নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য হয়না – এই যুক্তি বা অবস্থানের উপর ভিত্তি করেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী জোট তখন ব্যাপক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী আদায় করে নিয়েছিল। এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনেই ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৯ সালে তিনটা জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ঐ নির্বাচনগুলোকে আন্তর্জাতিক মহলও মেনে নিয়েছিল এবং বিশ্বের সকল গনতান্ত্রিক দেশ উক্ত নির্বাচনগুলোতে বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। ছোট-খাটো(সূক্ষ বা স্থূল) ভোট কারচুপির অভিযোগ ছাড়া উল্লেখিত তিনটা নির্বাচনে পরাজিত দল ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার কথা বললেও নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেনি বা এ নিয়ে কোন আন্দোলনও করেনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন প্রত্যেকটা দল/সরকারই তাদের ৫ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে।

কিন্তু ২০০৯ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরংকুশ আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার গোপন বাসনা পূরন করার কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এ ব্যাপারে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তাব বা সুপারিশ প্রাপ্তির লক্ষ্যে একটা সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। সংসদীয় কমিটির কাছে দেশের সকল পেশা ও শ্রেনীর প্রায় ৯০ ভাগ বিজ্ঞ জন, সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে দেওয়া মতামতকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে, ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনেই যাতে নির্বাচন হয় – সেভাবে সংবিধান সংশোধনের জন্য শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। ঐ সময় সুপ্রীম কোর্টের বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে অগনতান্ত্রিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে সংবিধান থেকে তা বাতিল করার পক্ষে মত দিয়ে এক রায় জারী করে। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ একে পোয়া-বারো হিসেবে পেয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২ বছর আগেই তড়িঘড়ি করে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে পঞ্চোদশ সংশোধনী পাশ করে নেয়।

অথচ ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কোন বিচারপতি বা উচ্চ আদালত একে অগনতান্ত্রিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেনি এবং ২০০৯ সালের নির্বাচনের পূর্বে বা পরে কোন মহল থেকে এ ব্যবস্থা বাতিল করার দাবীও জানানো হয়নি বা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ক্ষমতায় গেলে তারা এ ব্যবস্থা বাতিল করবে বলে কোন অংগীকার ছিলনা। এমনকি খায়রুল হকের রায়ে “সংসদ বিবেচনা করলে” পরবর্তি আরো ২টা জাতীয় নির্বাচন কিছু সংশোধনী সাপেক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে করা যেতে পারে বলে উল্লেখ ছিল। কিন্তু প্রচন্ড ক্ষমতালোভী মানসিকতা থেকে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ রায়ের অপর অংশকে বিবেচনা না করে দলীয় সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় থাকায় তারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা একবারেই বাতিল করে দেয়।

১৯৯৬ সালে যে যুক্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পক্ষে দৃঢ অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবী আদায় করেছিল, এখন তা বেমালুম ভুলে গিয়ে সম্পূর্ন উল্টো সুরে কথা বলছে। এখন বলছে, কোন অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা একদিনের জন্যও দেশ শাসন করা অগনতান্ত্রিক ও সংবিধান পরিপন্থি। এই যুক্তি বা কথা ১৯৯৬ সালে কি শেখ হাসিনা বা তার দল বা উচ্চ আদালতের কোন বিচারপতি বুঝতে পারেনি? নির্বাচনকালীন (৩ মাসের জন্য ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ও তার দল উপলব্ধি করতে পেরেছিল, ২০১৪ সালে এসেও কি বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার (দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রশাসন, আইণ শৃংখলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের সার্বিক শাসন ব্যবস্থাকে দলীয়করন করা) পরিবর্তন বা উন্নতি হয়ে গেছে? এ প্রসঙ্গে ভারতসহ যেসব পশ্চিমা বা উন্নত গনতান্ত্রিক দেশের উদাহরন বা তুলনা দেওয়া হয়, আমাদের দেশের জনগন ও রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কি বিগত ২৩ বছরে (’৯০ এর পর থেকে) এমন গনতান্ত্রিক মন-মানসিকতা ও গনতান্ত্রিক চর্চায় অদৌ একচুলও অগ্রসর হতে পেরেছে?

শেখ হাসিনা ও তার দোসররা এখন বলছে, কোন অনির্বাচিত সরকার দেশ শাসন করতে পারবেনা। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত হলেও তারা তো ৫ বছরের জন্য দেশ শাসন করতে আসেনা; তারা শুধু একটা সংসদের মেয়াদ শেষ হলে আর একটা নির্বাচিত সংসদ আসা পর্যন্ত ৩ মাসের জন্য দেশ পরিচালনা মূলত একটা গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। ঐ সময় একমাত্র রাষ্ট্রীয় জরুরী, নির্বাচন সংক্রান্ত ও রুটিন মাফিক কাজ ছাড়া অন্য কোন নীতি নির্ধারনী কাজকর্ম করা থেকে এঁরা বিরত থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে শেখ হাসিনা ও তার সমর্থকরা বার বার ২০০৭-২০০৮ সময়ের মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদাহরন দেয়। তিন মাসের জন্য এসে তারা ২ বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। অথচ ঐটা প্রকৃত অর্থে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিলনা তা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ ভালভাবেই জানে, ঐটা ছিল জেনারেল মইনের সেনা সমর্থিত একটা সরকার, যা ২০০৮ এর নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভয়াবহ সহিংস আন্দোলনের পরিণতি। যেটাকে শেখ হাসিনা ও তার দল বার বার বলেছিল, ঐ কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল এবং যাদের অভিষেক অনুষ্ঠানে বিএনপি না গেলেও শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা বঙ্গভবনে বেশ আনন্দঘন ভাব-ভঙ্গি ও সাজ-গোছ করে প্রথম সারিতে বসেছিল। শুধু তাই নয়, ভূয়া ভোটার বাতিল করার জন্য (যেখানে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য হাই কোর্টের নির্দেশ ছিল, তা না করে) আওয়ামী লীগ দাবী করল ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করার। এই সুয়োগে নির্বাচন কমিশন আর একটু আগ বাড়িয়ে ছবিযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র করার পরিকল্পনা পেশ করে, যেজন্য কমপক্ষে ১৮ মাস সময় লাগার কথা জানায়। আওয়ামী লীগও তাতে সাড়া দেয়। যে সুবাদে ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২ বছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। এজন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। তাছাড়া জেনারেল মইনের ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ও আশীর্বাদে নির্বাচন করেইতো আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিল।

সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা খারাপ এ কথা তাদের মূখে মানায়না বা মানা যায়না। নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য হয়না বলেইতো বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার ব্যবস্থা থাকা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। তারা শুধু একটা রেফারীর ভূমিকা পালন করবে, এখানে মাত্র ৩ মাসের জন্য সীমিত পরিসরে রাষ্ট্র পরিচালনায় অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ( সবার কাছে গ্রহনযোগ্য ) সমন্বয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল থাকলে কি বাংলাদেশ রসাতলে চলে যাবে, নাকি সংবিধান ধ্বংস হয়ে যাবে? বরং নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই বাংলাদেশে জাল ভোট, ভোট ডাকাতি, আন্দোলন, সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। তাহলে দেশ ও মানুষের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য কোনাটা প্রয়োজন? ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোর পর কি নির্বাচনের ফলাফলকে নিয়ে বা আর একটা মধ্যবর্তি নির্বাচনের দাবীতে পরাজিত দল কি দেশে লাগাতার আন্দোলন বা অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল ? তাছাড়া, তিন বার এই ব্যবস্থা অনুসরণ করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় যদি কোন ত্রুটি বা সমস্যা আছে বলে মনে হত – সবার সম্মিলিত আলোচনা বা সমঝোতার ভিত্তিতে তা সংশোধন করা যেত। সংবিধান অুনযায়ী জনগন যদি সার্বভৌম ও সকল ক্ষমতার উৎস বলে গনতন্ত্রের বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়, তবে জনগন বা দেশের প্রয়োজনেইতো সংবিধানে সংযোজন, পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আগে থেকেই তৈরী বা অহি রূপে নাজেল হওয়া কোন সংবিধান পায়নি। বাংলাদেশের জনগনই দেশ পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রনয়ন করেছিল। তাই সংবিধানে নাই বলে বা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে জনগন ও দেশের শান্তি, শৃংখলা, ঐক্যমত ও সমঝোতাকে উপেক্ষা করে সংবিধানকে জনগনের উর্দ্ধে স্থান দেওয়া কি বাস্তবসম্মত বা গ্রহনযোগ্য? তাছাড়া যে কোন রাজনৈতিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে ঐক্যমতে পৌছায় এবং সেভাবে সংবিধানকে সাজিয়ে নিয়ে দেশ চালায়। যে কোন রাজনৈতিক বিষয় আদালত থেকে নির্দেশিত বা মীমাংসিত হওয়া কখনও উচিত বা সঠিক নয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগ বিভিন্ন রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ন বিষয়কে আদালতের মাধ্যমে বা আদালতকে ব্যবহার করে তাদের অনুকূলে নেওয়ার কৌশল অনুসরন করে যাচ্ছে। আসল কথা হল, শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ জনগনের মতামত ও গনতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা এবং যেভাবেই হউক ( ছলে বলে কৌশলে ) দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। বিদগ্ধরা বলে থাকে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তী ( ৫০ বছর )তে সে বা তার দলই ক্ষমতায় থেকে উদযাপন করতে পারে এ জন্য যেভাবেই হউক ( অগনতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী কায়দায়) তারা ২০২১ সাল পর্যন্ত বা সম্ভব হলে আরো বেশী সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেই। আর এজন্যই কোন কিছু তোয়াক্কা না করে, তারা তাদের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে সংবিধান থেকে তড়িঘড়ি করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী তাদের অধীনেই একটা অগনতান্ত্রিক, অগ্রহনযোগ্য (সকল দলের অংশগ্রহন ছাড়া) নির্বাচনের মাধ্যমে গায়ের জোরে ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে প্রধান ও বৃহত্তম বিরোধী দল অংশগ্রহন করেনি, বরং বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য ৫ জানুয়ারীর আগে একটানা ৩ মাস সারা দেশে ব্যাপক সহিংস আন্দোলন চালিয়েছিল। যার ফলে বিরোধী জোটের আন্দোলনের মূখে ৫ জানুয়ারীর আগে শেখ হাসিনসহ তার জোটের শীর্ষ নেতারা সবাই বলেছিল, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রক্ষা করতে এবং নিয়ম রক্ষার জন্যই তারা ৫ জানুয়ারী দশম সংসদ নির্বাচন করতে বাধ্য হচ্ছে। এটা একটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। নির্বাচনের পর তারা সবার অংশগ্রহনমূলক আর একটা নির্বাচনের ব্যাপারে বিরোধী জোটার সাথে আলোচনায় বসবে। নির্বাচনের পর পর শেখ হাসিনা ও তার জোটের নেতা-নেত্রীরা আলোচনার জন্য বি,এন,পি জোটকে হরতাল অবরোধসহ সকল আন্দোলনের কর্মসূচী বাতিলসহ একের পর এক বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ৫ জানুয়ারীর আগে বিরোধী জোট তথা জাতির কাছে দেওয়া আশ্বাস বা অংগীকার অনুযায়ী আর একটা নির্বাচনের ব্যাাপারে বিরোধী জোটের সাথে আলোচনায় না বসার কৌশল অবলম্বন শুরু করে।

এক্ষেত্রে সফলও হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। এখন, শেখ হাসিনা সহ তার জোটের বড় ও পাতি নেতা সবাই সূর তুলছে, তারা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে এবং ২০১৯ সালের আগে আর কোন নির্বাচন নয়। এর আগে বিরোধী দলের সাথে কোন আলোচনাও করা হবেনা। ৫ জানুয়ারীর আগের কথাগুলো এখন তারা মনে হয় সচেতনভাবে বেমালুম ভুলে গেছে। এখন বিরোধী জোট বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চরম উস্কানী ও অসৌজন্যমূলক উক্তি ও বিষেদগার করে তাদের সাথে আলোচনা করার কোন সুযোগ নাই বা প্রশ্নই উঠেনা বলে শেখ হাসিনা ও তার দলের লোকেরা দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে বেশ দাম্ভিকতার সাথে ও জোরালোভাবে বলে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তার দোসররা বলছে, দেশে এখন শান্তি বিরাজ করছে, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, এখন মধ্যবর্তি বা আর একটা নির্বাচনের কোন প্রয়োজন নাই। তারা হয়ত ভুলে গেছে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে সারা দেশে একটানা ৩ মাস কি ধরনের আন্দোলন চলছিল, অথবা ক্ষমতাসীনরা হয়ত ভাবছে বিএনপি জোট এখন আর সরকারের বিরুদ্ধে সে ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেনা। অতএব বিরোধী জোটের সাথে আর কোন আলোচনা না করলে বা মধ্যবর্তি নির্বাচন না দিলেও তারা ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবে। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতালোভী আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী ও অগনতান্ত্রিক মানসিকতা ও চরিত্রের পরিচয় আবারও প্রকাশ পেয়েছে।

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x